১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ৪ঠা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৪ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ২:৪৫ বুধবার বসন্তকাল
পাবলিক টয়লেটে প্রবেশের পর অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, দুর্গন্ধ এবং অসংখ্য মানুষের ব্যবহৃত সিট দেখে অনেকের মনেই তীব্র অস্বস্তি বা ‘ঘিনঘিনে’ অনুভূতির সৃষ্টি হয়। অনেকেই ভাবেন, টয়লেট সিটে বসার মাধ্যমেই হয়তো ভয়াবহ কোনো রোগ শরীরে বাসা বাঁধবে। এই ভয় থেকে কেউ কেউ অদ্ভুত সব কসরত করে টয়লেট ব্যবহার করেন। কিন্তু বিজ্ঞান কী বলছে? টয়লেট সিট থেকে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি আসলে কতটা?

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং মাইক্রোবায়োলজিস্টদের সাম্প্রতিক আলোচনায় উঠে এসেছে বাথরুমের জীবাণু এবং সংক্রমণ সংক্রান্ত নানা চমকপ্রদ তথ্য।
রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি ও বাস্তবতা
ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার জনস্বাস্থ্য ও মাইক্রোবায়োলজির অধ্যাপক জিল রবার্টস জানিয়েছেন, তাত্ত্বিকভাবে টয়লেট সিট থেকে রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকলেও বাস্তবে এই ঝুঁকি অত্যন্ত কম।
সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বড় ভীতি থাকে যৌনবাহিত রোগ (এসটিডি) নিয়ে। তবে বিশেষজ্ঞরা আশ্বস্ত করছেন যে, গনোরিয়া বা ক্ল্যামিডিয়ার মতো জীবাণুগুলো মানবদেহের বাইরে, বিশেষ করে টয়লেট সিটের মতো ঠান্ডা ও শক্ত পৃষ্ঠে বেশিক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে না। সাধারণত সরাসরি শারীরিক তরল বিনিময় বা যৌন সংস্পর্শ ছাড়া এসব রোগ ছড়ায় না। অধ্যাপক রবার্টস আরও জানান, যদি টয়লেট সিট থেকেই এসটিডি ছড়াত, তবে শিশু বা যৌন সম্পর্কে লিপ্ত নন এমন মানুষদের মধ্যেও এসব রোগের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা যেত।
রক্তবাহিত রোগ বা ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই) সিট থেকে ছড়ানোর আশঙ্কাও ক্ষীণ। ইউটিআই সাধারণত নিজের মল পরিষ্কারের সময় অসাবধানতাবশত জীবাণু মূত্রনালীর দিকে চলে গেলে হতে পারে, সিট থেকে সরাসরি হওয়ার সুযোগ কম।
যেসব ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি
ঝুঁকি কম হলেও কিছু কিছু ভাইরাস দীর্ঘসময় পরিবেশে টিকে থাকতে পারে। যেমন—হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি)। নেভাদার টুরো ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ক্যারেন ডুস জানান, এইচপিভি ভাইরাস বাথরুমের সিটে এক সপ্তাহ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে এবং সাধারণ হ্যান্ড স্যানিটাইজারে এটি ধ্বংস হয় না। তবে এই ভাইরাস সংক্রমণের জন্য ত্বকে ক্ষত বা র্যাশ থাকা প্রয়োজন। একইভাবে হারপিস ভাইরাসের ক্ষেত্রেও ত্বকের ক্ষত এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা থাকলে সংক্রমণের সামান্য ঝুঁকি থাকে।
টিস্যু ব্যবহার বা ‘স্কোয়াট’ করে বসা কি সমাধান?
অনেকে টয়লেট সিটের ওপর টিস্যু পেপার বিছিয়ে নেন বা সিট স্পর্শ না করে শূন্যে ভেসে (স্কোয়াট করে) টয়লেট সারেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পদ্ধতিগুলো খুব একটা কার্যকর নয়।
১. টিস্যু পেপার: এটি ছিদ্রযুক্ত উপাদান দিয়ে তৈরি, তাই জীবাণু সহজেই এর ভেতর দিয়ে শরীরে পৌঁছাতে পারে।
২. স্কোয়াট বা শূন্যে বসা: ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটি ওয়েক্সনার মেডিকেল সেন্টারের বিশেষজ্ঞ স্টেফানি ববিঞ্জারের মতে, এভাবে বসলে পেলভিক পেশিতে টান পড়ে এবং মূত্রথলি পুরোপুরি খালি হয় না। দীর্ঘমেয়াদে এটি বরং ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
আসল বিপদ কোথায়?
টয়লেট সিট নয়, বরং বাথরুমে রোগ ছড়ানোর মূল মাধ্যম হলো আমাদের ‘হাত’। অধ্যাপক রবার্টস সতর্ক করে বলেন, টয়লেট ফ্লাশ, দরজার হাতল বা সিট স্পর্শ করার পর সেই হাত না ধুয়ে মুখে বা নাকে দিলে ইশেরিশিয়া কোলাই, স্যালমোনেলা কিংবা নোরোভাইরাসের মতো জীবাণু শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে নোরোভাইরাস অত্যন্ত সংক্রামক এবং এটি বাথরুমের বিভিন্ন পৃষ্ঠে দীর্ঘসময় টিকে থাকে।
গবেষণায় দেখা গেছে, কম্পিউটার ল্যাবের কিবোর্ডে বাথরুমের কমোডের চেয়েও বেশি জীবাণু থাকতে পারে। এমনকি নিয়মিত পরিষ্কার করার কারণে বাসার টয়লেটের তুলনায় পাবলিক টয়লেট অনেক ক্ষেত্রে বেশি নিরাপদ হতে পারে।
‘টয়লেট স্নিজ’ বা ফ্লাশ করার ঝুঁকি
ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনার ভাইরোলজি অধ্যাপক চার্লস গারবা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছেন, যা ‘টয়লেট স্নিজ’ নামে পরিচিত। টয়লেট ফ্লাশ করার সময় পানির ঝাপটায় ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ জীবাণু কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং বাথরুমের অন্যান্য স্থানে (যেমন—তোয়ালে, ব্রাশ, দরজার হাতল) ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি ক্লস্ট্রিডিয়াম ডিফিসিল-এর মতো কঠিন জীবাণুও এভাবে ছড়াতে পারে।
অনেকে মনে করেন কমোডের ঢাকনা বন্ধ করে ফ্লাশ করলে মুক্তি মিলবে। কিন্তু ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকনার ফাঁক দিয়ে জীবাণু ঠিকই বেরিয়ে আসে, তাই এটি খুব একটা কার্যকর নয়।
সুরক্ষিত থাকার উপায়
বিশেষজ্ঞরা বাথরুম ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ কিন্তু কার্যকর পরামর্শ দিয়েছেন:
- স্পর্শ কমানো: টয়লেটের বিভিন্ন পৃষ্ঠ বা সিট অযথা স্পর্শ না করা।
- হাত ধোয়া: টয়লেট ব্যবহারের পর এবং মুখে হাত দেওয়ার আগে অবশ্যই সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধুতে হবে।
- দ্রুত বেরিয়ে আসা: অধ্যাপক গারবার পরামর্শ হলো, ফ্লাশ করার পর সেখানে দাঁড়িয়ে না থেকে দ্রুত বের হয়ে আসা উচিত, যাতে বাতাসে ভাসা জীবাণু শরীরে না লাগে।
- অপেক্ষা করা: পাবলিক টয়লেটে কেউ বের হওয়ার পর অন্তত ১০ মিনিট অপেক্ষা করে প্রবেশ করা ভালো, যদিও বাস্তবে তা সবসময় সম্ভব হয় না।
পরিশেষে, টয়লেট সিট নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা এবং হাত ধোয়ার অভ্যাসের দিকে নজর দেওয়াই সুস্থ থাকার মূল চাবিকাঠি।
Analysis | Habibur Rahman