৭ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২১শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১লা শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি রাত ১:৩০ শনিবার বসন্তকাল
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের বিপক্ষে মাঠে না নামার যে অনড় সিদ্ধান্ত পাকিস্তান নিয়েছে, তা কেবল রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং বিশ্ব ক্রিকেটের অর্থনীতিতে বড়সড় ধসের আশঙ্কা তৈরি করেছে। আর এই আর্থিক সুনামির আঁচ থেকে রেহাই পাচ্ছে না বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও (বিসিবি)। পাকিস্তানের এমন কঠোর অবস্থানের পর বিসিবির অন্দরমহলে এখন শুধুই উৎকণ্ঠা।
আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) বয়কটের কারণ স্পষ্ট না করলেও, এর নেপথ্যে ভারতের সাথে রাজনৈতিক বৈরিতা এবং সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রতি আইসিসির আচরণের প্রতিবাদ—উভয়ই বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে কারণ যাই হোক, মিরপুরের শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে বিসিবির কার্যালয়ে এখন প্রধান আলোচনার বিষয়—আইসিসির লভ্যাংশ কমে গেলে বাংলাদেশের ক্রিকেট চলবে কী করে?

অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের হিসাব-নিকাশ
বিশ্ব ক্রিকেটে আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ। সম্প্রচারস্বত্ব থেকে শুরু করে স্পনসরশিপ—সবকিছুর মূল আকর্ষণ এই ‘হাই-ভোল্টেজ’ লড়াই। পাকিস্তান সেই লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানোয় আইসিসির সামগ্রিক আয়ে বড় ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিসিবির এক প্রভাবশালী পরিচালক বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, আইসিসির আয়ের অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশ বড় অঙ্কের লভ্যাংশ পেয়ে থাকে, যা বোর্ডের বার্ষিক ব্যয়ের প্রধান উৎস। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ না হলে আইসিসির আয় কমবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বিসিবির কোষাগারে।
ওই পরিচালক বলেন, “কেনিয়া বা উগান্ডার মতো সহযোগী দেশগুলোর জন্য হয়তো এক-দুই লাখ ডলারের অনুদানই যথেষ্ট। কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটের যে বিশাল অবকাঠামো এবং ব্যয়বহুল কার্যক্রম, তা আইসিসির লভ্যাংশ কমে গেলে সচল রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। ঘরোয়া লিগ বা স্থানীয় স্পনসর থেকে যে আয় আসে, তা দিয়ে বোর্ডের সারা বছরের খরচ মেটানো কঠিন।”
পাকিস্তানের ‘কঠিন বার্তা’ ও বাংলাদেশের প্রসঙ্গ
পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্তকে কেবল ভারতের বিপক্ষে বয়কট হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। পিসিবি প্রধান মহসিন নাকভি বেশ কিছুদিন ধরেই বাংলাদেশের ভেন্যু পরিবর্তন এবং বিশ্বকাপ আয়োজন থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছিলেন। আইসিসির বোর্ড মিটিংয়েও তিনি বাংলাদেশের পক্ষে সরব ছিলেন।
বিসিবির একাংশ মনে করছে, পাকিস্তানের এই বয়কট ভারতের ক্রিকেটীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে একটি কঠোর বার্তা। বিশেষ করে, বাংলাদেশকে পাশ কাটিয়ে আইসিসির সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রতিবাদ হিসেবেও অনেকে একে দেখছেন। বিসিবির এক পরিচালকের মতে, “আইসিসি আমাদের কথা ঠিকমতো না শুনেই যেভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছে, তার একটা জবাব প্রয়োজন ছিল। পাকিস্তান হয়তো সেই জায়গা থেকেই ভারতের বিপক্ষে খেলার সিদ্ধান্ত বর্জন করেছে। তবে দিনশেষে এর আর্থিক খেসারত আমাদেরও দিতে হবে।”
ভবিষ্যৎ সূচি ও ক্রিকেট কূটনীতি
মাঠের লড়াইয়ের বাইরে ভারত ও বাংলাদেশের ক্রিকেট কূটনীতিতেও এখন শীতল সম্পর্ক বিরাজমান। পাকিস্তানের এই বয়কটের সিদ্ধান্ত এশিয়া কাপসহ ভবিষ্যৎ ফিউচার ট্যুরস প্রোগ্রামে (এফটিপি) নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের উত্তেজনা কমে যাওয়া এবং একপেশে ফলাফলের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ইকোসিস্টেম’ বা ক্রিকেটের পুরো বাণিজ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ভয়।
আপাতত বিসিবির কর্তারা তাকিয়ে আছেন আইসিসি ও দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ডের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। সংকটের মেঘ কাটবে, নাকি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে দেশের ক্রিকেট—তা সময়ই বলে দেবে। তবে আলোচনার দরজা যে এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, সেই আশাবাদ ব্যক্ত করে এক বোর্ড কর্তা বলেন, “দেখা যাক, জল কোন দিকে গড়ায়।”
Analysis | Habibur Rahman