১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৫:১২ সোমবার বসন্তকাল
প্রায় দুই দশক ধরে যে আকাশপথ ছিল নীরব, সেখানে আবারও শোনা যাবে ইঞ্জিনের গর্জন। ঢাকা ও করাচির মধ্যে সরাসরি উড়োজাহাজ চলাচল আর কল্পনা নয়, বরং এক আসন্ন বাস্তবতা। তবে এটি কেবল দুটি শহরের মধ্যে দূরত্ব কমানোর গল্প নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার এক জটিল ও সংবেদনশীল সম্পর্কের বরফ গলানোর এক সতর্ক প্রচেষ্টা। যখন পাকিস্তানের পতাকাবাহী বিমান ঢাকার মাটি স্পর্শ করবে, তখন সেটি শুধু একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইট হবে না; হবে ইতিহাস, রাজনীতি আর অবিশ্বাসের দেয়াল টপকে দুই দেশের জনগণের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের এক পরীক্ষামূলক উড়ান।
শুধু বাণিজ্যিক নয়, একটি কূটনৈতিক উড়ান
পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুটি এয়ারলাইন্সকে ঢাকায় ফ্লাইট পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা দীর্ঘদিনের একটি অচলায়তনের অবসান ঘটাচ্ছে। এতদিন দুবাই, দোহা বা দিল্লির মতো তৃতীয় কোনো দেশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে যে ভ্রমণ সম্পন্ন করতে হতো, তা মাত্র তিন ঘণ্টায় শেষ হবে। আপাতদৃষ্টিতে এটি বাণিজ্য, চিকিৎসা পর্যটন এবং ধর্মীয় ভ্রমণের সুযোগ উন্মুক্ত করার একটি বাণিজ্যিক পদক্ষেপ।
কিন্তু এর গভীরে রয়েছে এক নিপুণ কূটনৈতিক কৌশল, যাকে বলা হচ্ছে ‘কানেক্টিভিটি ডিপ্লোম্যাসি’। ১৯৭১ সালের পর থেকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক এক জটিল ও বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়েছে। এই সরাসরি ফ্লাইট সেই সম্পর্কে আস্থা ফিরিয়ে আনার একটি বাস্তবসম্মত এবং পরিমাপযোগ্য পদক্ষেপ। এটি এমন এক উদ্যোগ, যা রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরের চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যখন দুই দেশের সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী এবং রোগীরা সহজে একে অপরের দেশে যাতায়াত করতে পারবেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই সম্পর্কের শীতলতা কমতে শুরু করবে।
অর্থনীতির আড়ালে সম্পর্কের রসায়ন
এই উদ্যোগের ফলে দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়বে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। পাকিস্তানের চিকিৎসা সেবা বাংলাদেশি রোগীদের জন্য সহজলভ্য হবে, আবার পর্যটকদের জন্য বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থানগুলো ভ্রমণের পথ খুলবে। বিশেষ করে, দুই দেশেই ছড়িয়ে থাকা সুফি মাজার ও ধর্মীয় স্থানগুলো কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী পর্যটন বলয় গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে অর্থনৈতিক সুবিধার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—এই সংযোগ কি দুই দেশের মানসিক দূরত্ব কমাতে পারবে? পাকিস্তান এই পদক্ষেপকে ‘বিশ্বাস পুনর্গঠনের উপায়’ হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশও ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে, দুই দেশ তাদের ঐতিহাসিক ক্ষতগুলোকে পেছনে ফেলে ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে কতটা প্রস্তুত, তার উপর।
এই আকাশপথের মিলন তাই কেবল দুটি শহরের দূরত্ব কমানো নয়, বরং দুই দেশের মানসিক দূরত্বের বরফ গলানোর এক সতর্ক প্রচেষ্টা। এই উড়োজাহাজের চাকা যখন ঢাকার মাটি স্পর্শ করবে, তখন তা দুই দেশের সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে, যার সাফল্য বা ব্যর্থতা আগামী দিনের ইতিহাসই নির্ধারণ করবে।
Analysis | Habibur Rahman


