.
আন্তর্জাতিক

পশ্চিম তীরে নামাজরত ফিলিস্তিনিকে গাড়ি চাপা: এক ভিডিও, বহু প্রশ্ন

Email :32

১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৫:৪৫ সোমবার বসন্তকাল

ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরে আবারও এমন একটি ঘটনা সামনে এসেছে, যা অঞ্চলটির দীর্ঘদিনের দমন–পীড়নের বাস্তবতাকে নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। সড়কের পাশে বসে শান্তভাবে নামাজ আদায় করছিলেন এক ফিলিস্তিনি। ঠিক সেই মুহূর্তে একটি দ্রুতগতির গাড়ি তাঁর দিকে ছুটে আসে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই প্রার্থনারত ওই মানুষটিকে সজোরে ধাক্কা দেয় গাড়িটি। ঘটনাটি ক্যামেরাবন্দী হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ভিডিওটি প্রথম সম্প্রচার করে Palestinian Television। পরবর্তীতে ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করে নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা Reuters। যাচাইকৃত ফুটেজে দেখা যায়, বেসামরিক পোশাক পরিহিত এক ব্যক্তি কাঁধে আগ্নেয়াস্ত্র ঝুলিয়ে একটি অফ-রোড যান চালাচ্ছেন। কোনো সতর্কতা ছাড়াই তিনি রাস্তার ধারে নামাজে বসা ফিলিস্তিনির দিকে গাড়িটি সজোরে চালিয়ে দেন।

সামরিক বাহিনীর স্বীকারোক্তি

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর Israel Defense Forces (আইডিএফ) এক বিবৃতিতে জানায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন রিজার্ভিস্ট সেনা। ঘটনাটি গত বৃহস্পতিবার West Bank-এর একটি এলাকায় ঘটে। আইডিএফ দাবি করে, ঘটনার আগে ওই এলাকায় ‘সতর্কতামূলক গুলি’ ছোড়া হয়েছিল, যদিও ভিডিও ফুটেজে তার কোনো প্রমাণ স্পষ্ট নয়।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ওই রিজার্ভিস্ট সেনা তাঁর ক্ষমতার ‘গুরুতর অপব্যবহার’ করেছেন। এর পরপরই তাঁকে সামরিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে। ইসরায়েলি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত সেনাকে আপাতত গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে। তবে এই ঘটনায় ফৌজদারি মামলা হবে কি না, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো পরিষ্কার অবস্থান জানায়নি।

ভুক্তভোগীর অবস্থা

গাড়ির ধাক্কায় আহত ফিলিস্তিনিকে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা জানান, তাঁর আঘাত গুরুতর নয়। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাঁকে বাড়ি ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, শারীরিক ক্ষতির চেয়েও বড় বিষয় হলো—এই ধরনের হামলা ফিলিস্তিনিদের দৈনন্দিন জীবনে স্থায়ী আতঙ্ক তৈরি করছে।

সহিংসতার বিস্তৃত প্রেক্ষাপট

এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। United Nations-এর বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও সামরিক অভিযানের মাত্রা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জাতিসংঘ ২০২৫ সালকে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের জন্য সবচেয়ে সহিংস বছরগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

পরিসংখ্যান বলছে, শুধু চলতি বছরেই অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ৭৫০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো—২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে পশ্চিম তীরে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের বড় একটি অংশ ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে এবং বাকিরা অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় প্রাণ হারান।

প্রশ্নের মুখে জবাবদিহি

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ভিডিওতে ধারণ করা এই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে প্রায়ই ‘ব্যক্তিগত ভুল’ বা ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ বলে দায় এড়িয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে খুব কম ক্ষেত্রেই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হয়। ফলে একই ধরনের সহিংসতা বারবার ঘটছে।

পশ্চিম তীরের এই সাম্প্রতিক ভিডিও শুধু একজন নামাজরত মানুষের ওপর গাড়ি চালানোর দৃশ্য নয়—এটি একটি দীর্ঘ দখলদারিত্ব, জবাবদিহির অভাব এবং প্রতিদিনকার মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts