১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৫:৪৭ সোমবার বসন্তকাল
ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘ প্রায় চার বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার কৌশলগত সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং-উন দেশটির একটি পারমাণবিক সাবমেরিন নির্মাণ কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। পিয়ংইয়ংয়ের নৌ-শক্তি বৃদ্ধির এই তৎপরতার মধ্যেই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছ থেকে একটি বিশেষ বার্তা পেয়েছেন কিম, যেখানে দুই দেশের সম্পর্ককে ‘অটুট বন্ধুত্ব’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরির কারখানা পরিদর্শন করেছেন উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং–উন। কেসিএনএ ২৫ ডিসেম্বর এই ছবি প্রকাশ করেছেছবি: এএফপি
বৃহস্পতিবার (২৬ ডিসেম্বর) উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কেসিএনএ এই তথ্য নিশ্চিত করেছে এবং কিমের পরিদর্শনের বেশ কিছু ছবি প্রকাশ করেছে।
সাবমেরিন ইয়ার্ডে কিমের শক্তি প্রদর্শন
কেসিএনএ প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, কিম জং-উন একটি বিশাল আকৃতির সাবমেরিনের পাশে দাঁড়িয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করছেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কন্যা কিম জু আয়ে এবং উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিদর্শন কেবল একটি রুটিন ওয়ার্ক নয়, বরং এটি উত্তর কোরিয়ার নৌ-আধুনিকায়নের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।
পরিদর্শনকালে কিম জং-উন নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র যুক্ত করার ওপর জোর দেন। তিনি কর্মকর্তাদের কাছে নৌবাহিনীকে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা তুলে ধরেন এবং পানির তলদেশে ব্যবহারযোগ্য গোপন সমরাস্ত্র বা ‘আন্ডারওয়াটার সিক্রেট ওয়েপন’ নিয়ে চলমান গবেষণার অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। তবে এই গোপন অস্ত্রের বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
একইসঙ্গে কিম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, দক্ষিণ কোরিয়া যদি নিজস্ব পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরির চেষ্টা করে, তবে পিয়ংইয়ং সেটিকে তাদের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার ওপর সরাসরি হুমকি এবং আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করবে।
পুতিনের প্রশংসাসূচক বার্তা ও কুরস্ক ফ্রন্ট
কিম জং-উনের কাছে পাঠানো এক বার্তায় ভ্লাদিমির পুতিন দুই দেশের সামরিক সহযোগিতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বিশেষ করে রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে উত্তর কোরিয়ার সেনাদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে পুতিন বলেন, ‘তাদের এই বীরত্বপূর্ণ অবদান মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের অটুট বন্ধুত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ।’
পশ্চিমা ও দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহায়তা করতে উত্তর কোরিয়া হাজার হাজার সেনা রাশিয়ায় পাঠিয়েছে। কুরস্ক ফ্রন্টে মোতায়েন করা এসব সেনাদের কাছে রয়েছে ভারী আর্টিলারি, ক্ষেপণাস্ত্র এবং দূরপাল্লার রকেট সিস্টেম।
তবে এই যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও কম নয়। সিউলের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার হয়ে লড়াই করতে গিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার উত্তর কোরীয় সেনা নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও কয়েক হাজার। সম্প্রতি পিয়ংইয়ং স্বীকার করেছে যে, কুরস্ক অঞ্চলে মাইন অপসারণের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে গিয়ে তাদের বেশ কয়েকজন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন।
বিনিময় প্রথা: রক্তবনাম প্রযুক্তি
বিশ্লেষকরা বলছেন, মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের এই সম্পর্ক মূলত পারস্পরিক স্বার্থের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। রাশিয়ার হয়ে লড়াই করার জন্য উত্তর কোরিয়া জনবল ও গোলাবারুদ সরবরাহ করছে। এর বিনিময়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত উত্তর কোরিয়াকে রাশিয়া দিচ্ছে অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি, বিপুল আর্থিক সহায়তা, খাদ্য এবং জ্বালানি। এই সহযোগিতা কিম জং-উনের সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, বিশেষ করে সাবমেরিন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
২৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত ছবি এবং পুতিনের এই বার্তা প্রমাণ করে যে, ২০২৫ সালের শেষলগ্নে এসেও ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার জোট আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
Analysis | Habibur Rahman
