১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৫:৪৬ সোমবার বসন্তকাল
যে স্লোগানে কেঁপেছিল রাজপথ, যে বিপ্লবে বদলে গিয়েছিল দেশের ক্ষমতার ভরকেন্দ্র, সেই আন্দোলনের উত্তাপ এবার ছড়িয়ে পড়ছে উত্তরের প্রান্তিক জনপদ পঞ্চগড়ে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম এক পুরোধা সারজিস আলম এখন আর রাজপথের কর্মী নন, তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একজন প্রার্থী। এটি কেবল একজন ব্যক্তির রাজনীতিতে প্রবেশ নয়, বরং একটি প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার প্রতীকী রূপান্তর, যারা এখন ব্যবস্থার বাইরে থেকে নয়, ভেতর থেকে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ‘শাপলাকলি’ প্রতীকে পঞ্চগড়-১ আসন থেকে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের পর সারজিস আলমের কণ্ঠ ছিল আবেগ এবং দায়িত্বের ভারে মিশ্রিত। তিনি এটিকে ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে তার জন্মভূমির প্রতি “দায়বদ্ধতার অগ্নিপরীক্ষা” হিসেবেই দেখছেন। তার কথায়, “অতীতে অনেক মন্ত্রী পেয়েও আমার অভাগা পঞ্চগড় তার প্রাপ্য অধিকারটুকু পায়নি।” এই একটি বাক্যই যেন উত্তরের এই জেলার বহু বছরের বঞ্চনা আর হতাশার প্রতিধ্বনি।
সারজিস কেবল সমালোচনায় থেমে থাকেননি, দিয়েছেন পরিবর্তনের সুস্পষ্ট রূপরেখাও। তার অঙ্গীকারের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পঞ্চগড়ের মাটি থেকে চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও দুর্নীতির মূলোৎপাটন। তিনি কেবল স্বাস্থ্যখাতের বেহাল দশা তুলে ধরেননি, বরং পাঁচ বছরের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল ও নার্সিং কলেজ স্থাপনের মতো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার ভাবনায় রয়েছে পঞ্চগড়ের পরিবেশকে অক্ষুণ্ণ রেখে ‘গ্রিন ইন্ডাস্ট্রি’ বা সবুজ শিল্পায়ন, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি প্রকৃতির সুরক্ষাও নিশ্চিত করবে।
তবে সারজিসের এই পথচলা নিছক ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রকাশ নয়। তার দল, এনসিপি, নিজেদের লক্ষ্য সম্পর্কে যে বার্তা দিয়েছে, তা বাংলাদেশের রাজনীতির গতানুগতিক ধারার প্রতি এক সরাসরি চ্যালেঞ্জ। “আমরা জাতীয় পার্টির মতো গৃহপালিত বিরোধী দল হতে আসিনি,”—এই ঘোষণা প্রমাণ করে যে, তারা হয় ক্ষমতার চালকের আসনে বসতে চায়, নতুবা সংসদকে কাঁপিয়ে দেওয়া এক শক্তিশালী বিরোধী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে চায়। মাত্র কয়েকদিনে ১১০০ মনোনয়ন ফরম বিক্রি হওয়া এই নতুন দলের প্রতি জনমানুষের কৌতূহল ও প্রত্যাশারই প্রতিফলন।
পঞ্চগড়-১ আসনের এই লড়াই তাই আর দশটি নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মতো নয়। একদিকে বিএনপির ব্যারিস্টার নওশাদ জমির এর মতো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, অন্যদিকে সারজিস আলমের মতো রাজপথ থেকে উঠে আসা এক তরুণ তুর্কি। এই লড়াই শুধু একটি আসনের নয়, বরং এটি রাজপথের আদর্শ আর সংসদীয় রাজনীতির বাস্তবতার এক অগ্নিপরীক্ষা। জুলাই বিপ্লবের শক্তি কি পারবে ব্যালট বাক্সেও দেখাতে? পঞ্চগড়ের মানুষ কি এবার একজন আন্দোলনকর্মীর হাতেই তুলে দেবে তাদের ভাগ্য বদলের চাবিকাঠি? উত্তর মিলবে ভোটের ময়দানে।
Analysis | Habibur Rahman


