.
রাজনীতি

নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারিই, সময় বদলানোর কোনো সুযোগ নেই: মার্কিন কূটনীতিকদের সাফ জানালেন ড. ইউনূস

Email :3

৩০শে পৌষ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৪ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৪শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি সন্ধ্যা ৭:৪৯ বুধবার শীতকাল

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ নিয়ে জনমনে সৃষ্ট সব ধরনের ধোঁয়াশা ও সংশয় পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে নিজের অনড় অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, নির্ধারিত তারিখের ‘এক দিন আগেও নয়, এক দিন পরেও নয়’—আগামী ১২ ফেব্রুয়ারিই দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাবেক মার্কিন ভারপ্রাপ্ত আন্ডার সেক্রেটারি অ্যালবার্ট গম্বিস ও অ্যাম্বাসেডর-অ্যাট-লার্জ মোর্স ট্যান। গতকাল মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায়ছবি: প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং

গতকাল মঙ্গলবার (রোজ মঙ্গলবার) ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় যুক্তরাষ্ট্রের দুই সাবেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিগত প্রশাসনের সময় দায়িত্ব পালন করা সাবেক ভারপ্রাপ্ত আন্ডার সেক্রেটারি অ্যালবার্ট গম্বিস এবং অ্যাম্বাসেডর-অ্যাট-লার্জ মোর্স ট্যান এদিন প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

গুঞ্জন ও ভুয়া খবর প্রসঙ্গ
বৈঠকে নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন বা পেছানো নিয়ে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন গুঞ্জনের প্রসঙ্গ উঠে আসে। এ সময় ড. ইউনূস বলেন, একটি বিশেষ মহল নির্বাচনকে ঘিরে পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে এবং ভুয়া খবর প্রচার করছে। তিনি মার্কিন প্রতিনিধিদের আশ্বস্ত করে বলেন, কে কী বলল বা কোন ধরনের গুজব ছড়ালো, তা অন্তর্বর্তী সরকারের বিবেচ্য বিষয় নয়। সরকার নির্ধারিত সময়েই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে এবং এরপর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

সাবেক স্বৈরাচারী শাসকের সমর্থকরা এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) প্রযুক্তির অপব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর ভিডিও ছড়াচ্ছে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের জনগণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা এসব অপতথ্য ও ভুয়া ভিডিও শনাক্ত করতে সক্ষম হচ্ছে। এ সময় অ্যালবার্ট গম্বিস প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ‘ভুয়া খবর’।

জুলাই সনদ ও গণভোট
বৈঠকে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই সনদ’ বা জুলাই চার্টার নিয়ে গণভোট আয়োজনের বিষয়টিতেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ড. ইউনূস জানান, সরকার এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাবে। তাঁর মতে, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে তৈরি এই সনদটি যদি জনগণের ভোটে অনুমোদিত হয়, তবে তা দেশে গণতান্ত্রিক শাসনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এর ফলে ভবিষ্যতে আর কখনোই কোনো স্বৈরাচারী শক্তির উত্থান বা স্বৈরতন্ত্রের সুযোগ থাকবে না।

ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন: ‘এখনও সময় হয়নি’
বৈঠকের এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক দুই কূটনীতিক জানতে চান, দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ–পরবর্তী সময়ের মতো বাংলাদেশেও ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ (সত্য ও পুনর্মিলন) প্রক্রিয়া চালু করা সম্ভব কি না।

এর জবাবে শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. ইউনূস নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠতার কথা স্মরণ করে বলেন, তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার সেই প্রক্রিয়াটি খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তবে বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এখনই সেই উদ্যোগ নেওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি হয়নি।

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, “সত্য ও পুনর্মিলনের উদ্যোগ তখনই নেওয়া সম্ভব, যখন অপরাধীরা নিজেদের ভুল স্বীকার করে, অনুশোচনা করে এবং ক্ষমা চায়। কিন্তু বাংলাদেশে জুলাইয়ের আন্দোলনে ছাত্র-জনতাকে হত্যার মতো বর্বর অপরাধের বিপুল প্রমাণ থাকার পরেও অপরাধীরা সব অস্বীকার করে যাচ্ছে। উল্টো তারা নিহত তরুণদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করছে। যেখানে ন্যূনতম অনুশোচনা বা অনুতাপ নেই, সেখানে রিকনসিলিয়েশন শুরু করার সুযোগ নেই।”

নির্বাচনী প্রস্তুতি ও নিরপেক্ষতা
অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নির্বাচনী ট্রেন পুরোদমে চলতে শুরু করেছে। তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র দাখিল শেষ হয়েছে এবং আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার শুরু করবেন।

প্রধান উপদেষ্টা মার্কিন কূটনীতিকদের নিশ্চিত করেন যে, নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসন সম্পূর্ণ পক্ষপাতমুক্ত থাকবে। সব রাজনৈতিক দল যাতে সমান সুযোগ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) পায়, তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। উৎসবমুখর পরিবেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়াই সরকারের মূল লক্ষ্য।

প্রায় ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে নির্বাচন ছাড়াও জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশের পরিস্থিতি, তরুণ নেতৃত্বের উত্থান, রোহিঙ্গা সংকট এবং এসডিজি বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক ও জ্যেষ্ঠ সচিব লামিয়া মোরশেদ উপস্থিত ছিলেন। মার্কিন কূটনীতিকরা গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে দেশ পরিচালনার ভূয়সী প্রশংসা করেন।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts