১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:১৪ সোমবার বসন্তকাল
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছেন, তাঁদের দল ভোগবিলাস বা কর্মীদের পকেট ভারী করার জন্য রাজনীতি করে না। বরং তাঁদের মূল লক্ষ্য জাতির মুক্তি এবং একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। বিগত শাসনামলের দুর্নীতি, গুম ও দুঃশাসনের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, আগামী দিনে জনগণের সম্পদের আমানতদার হিসেবে কাজ করবে জামায়াত।

সোমবার (দুপুরে) কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়াম এবং পরবর্তীতে মেহেরপুর সরকারি উচ্চমাধ্যমিক বালক বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত পৃথক দুটি বিশাল নির্বাচনী জনসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আবরার ফাহাদ: সার্বভৌমত্বের প্রতীক
কুষ্টিয়ার জনসভায় জামায়াত আমির শহীদ আবরার ফাহাদকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ‘মূর্ত প্রতীক’ হিসেবে অভিহিত করেন। আবেগময় কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘‘আবরার ফাহাদ কেবল একটি নাম নয়, সে নিজেই একটি বিপ্লব। দেশের আধিপত্যবাদবিরোধী লড়াইয়ে সে কলম ধরেছিল, আর এটাই ছিল তার একমাত্র অপরাধ। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে মেধাবীদের মাঝ থেকে তাকে নির্মমভাবে বিদায় করা হয়েছে।’’
হত্যাকারীদের প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘‘যারা আবরারের ওপর এমন পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়েছে, তারা চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও অধম। তাদের আচরণ কোনো মানুষের হতে পারে না।’’ তিনি দেশের প্রতিটি তরুণ-তরুণীকে আবরার ফাহাদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশপ্রেমের মন্ত্রে দীক্ষিত হওয়ার আহ্বান জানান।
জুলাই বিপ্লব ও গুমের সংস্কৃতি
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের দামাল ছেলেরা প্রমাণ করেছে তারা আল্লাহ ছাড়া আর কোনো শক্তিকে পরোয়া করে না। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শহীদ ও গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘‘আয়নাঘর বানিয়ে বছরের পর বছর মায়েদের বুক খালি করা হয়েছে। অনেকের সন্ধান মিললেও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রসহ আটজন এখনো নিখোঁজ। আমরা সেই সব মায়েদের চোখের কোণে পানি নয়, রক্ত দেখেছি।’’
দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট নির্মূলের ঘোষণা
বিগত ৫৪ বছরে দেশের সম্পদ লুণ্ঠন হয়েছে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, নদী খননের নামে বাজেটের টাকা লুটপাট করা হয়েছে, কিন্তু নদী আর সচল হয়নি। কুষ্টিয়ায় চালের ট্রাক থেকে ৫ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘‘আমরা ক্ষমতায় গেলে সিন্ডিকেট ভেঙে চুরমার করে দেব। চাঁদাবাজিতে যারা লিপ্ত, তাদের ভালো কাজে লাগিয়ে পুনর্বাসন করা হবে।’’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘‘জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে জনগণের সম্পদের ওপর কেউ হাত দিতে পারবে না। আমরা হবো জনগণের চৌকিদার। জনপ্রতিনিধিদের প্রতিবছর তাদের সম্পদের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।’’
নারীর মর্যাদা ও যুবকদের কর্মসংস্থান
নির্বাচনী ইশতেহারের অংশ হিসেবে জামায়াত আমির নারীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি জানান, বড় শহরগুলোতে নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালু করা হবে এবং কর্মস্থলে পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। যুবকদের জন্য তিনি বলেন, ‘‘আমরা বেকার ভাতা দেওয়ায় বিশ্বাসী নই, বরং সরকারি খরচে যুবকদের দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করব।’’
প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া
জনসভা শেষে ডা. শফিকুর রহমান কুষ্টিয়া ও মেহেরপুরের বিভিন্ন আসনে দলীয় প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং তাদের হাতে দলীয় প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’ তুলে দেন।
কুষ্টিয়ার জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির ও কুষ্টিয়া-২ আসনের প্রার্থী মো. আবদুল গফুর। উপস্থিত ছিলেন কুষ্টিয়া-১ আসনের প্রার্থী বেলাল উদ্দীন, কুষ্টিয়া-৩ আসনের আমির হামজা, কুষ্টিয়া-৪ আসনের আফজাল হোসেন এবং ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ।
অন্যদিকে, মেহেরপুরের জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা নায়েবে আমির মাওলানা মাহবুব উল আলম। সেখানে মেহেরপুর-১ আসনের প্রার্থী তাজউদ্দীন খান ও মেহেরপুর-২ আসনের প্রার্থী নাজমুল হুদাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।
উভয় সমাবেশে জামায়াত আমির ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন, যেখানে কোনো বিভাজন বা সংঘাতের রাজনীতি থাকবে না।
Analysis | Habibur Rahman