১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ৬:৪১ সোমবার বসন্তকাল
ঐতিহাসিক শহর মেহেরপুর এখন যেন পরিণত হয়েছে এক উন্মুক্ত ভাগাড়ে। নাগরিকদের নিজেদের ফেলা বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়কেও আবর্জনার স্তূপ আর দুর্গন্ধই যেন নিত্যদিনের সঙ্গী। একটি ত্রিমুখী সংকট—ব্যর্থ বর্জ্য সংগ্রহ, অচল ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং কর্তৃপক্ষের দীর্ঘসূত্রিতা—মেহেরপুর পৌরবাসীর জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পৌর এলাকায় প্রতিদিন উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ কঠিন বর্জ্যের সিংহভাগই অপসারিত হচ্ছে না। দিনের পর দিন জমতে থাকা এই আবর্জনা পচে সৃষ্টি করছে তীব্র দুর্গন্ধ, যা পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরের প্রধান সড়কগুলো কিছুটা পরিচ্ছন্ন থাকলেও পাড়া-মহল্লাগুলোর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। নির্দিষ্ট ডাস্টবিন বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে বাসিন্দারা সড়কের পাশে, ড্রেনের মুখে কিংবা খালি জায়গায় আবর্জনা ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন।
এই সংকটকে আরও জটিল করেছে শহরের অপরিকল্পিত ও ভঙ্গুর ড্রেনেজ ব্যবস্থা। বেশিরভাগ ড্রেন আবর্জনায় ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনের পথ রুদ্ধ। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাটে নোংরা পানি জমে যায় এবং সেই পানির সাথে আবর্জনা মিশে এক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করে। ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের অভিযোগ, বারবার আবেদন করেও ড্রেন পরিষ্কার বা সংস্কারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
তবে সবচেয়ে হতাশাজনক চিত্রটি হলো পৌরসভার পরিবেশবান্ধব পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনাগার প্রকল্প। প্রায় চার বছর আগে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই পরিশোধনাগারটি এখন একটি “সাদা হাতি”তে পরিণত হয়েছে। অবকাঠামোগত ত্রুটি, প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবলের অভাবে চালুর দিন থেকেই এটি অকেজো হয়ে পড়ে আছে। যদি এই কেন্দ্রটি চালু করা যেত, তবে শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা বিভাগেও রয়েছে জনবলের তীব্র সংকট। প্রয়োজনের তুলনায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংখ্যা অপ্রতুল হওয়ায় পুরো শহর পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আধুনিক সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতির অভাবও এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এ বিষয়ে পৌর কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা নতুন করে একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র চালুর পরিকল্পনার কথা জানান। অর্থ বরাদ্দ পেলেই প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়। তবে অতীতের ব্যর্থতার কারণে পৌরবাসীর মধ্যে এই আশ্বাস নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। তারা শুধু প্রতিশ্রুতির বৃত্তে আটকে না থেকে, এই নাগরিক দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চান। একটি পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বাস্তবায়নই পারে ঐতিহাসিক এই শহরকে তার হারানো গৌরব ফিরিয়ে দিতে।
Analysis | Habibur Rahman
