.
জাতীয়

দীর্ঘ ক্ষমতার বিচ্ছেদে তৃণমূলে তৈরি হয়েছে ‘এবার আমাদের খাওয়ার পালা’ মানসিকতা: সেলিমা রহমান

Email :34

১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:১৩ সোমবার বসন্তকাল

দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ ক্ষমতার বাইরে থাকার ফলে তৃণমূল পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মনোজগতে বড় ধরনের নেতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। তাদের অনেকের মধ্যেই এখন কাজ করছে—‘এবার আমাদের খাওয়ার পালা’ বা সুবিধা আদায়ের মানসিকতা। দলের হাজার হাজার নেতাকর্মীর এই নৈতিক অবক্ষয় রোধ এবং তাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করাকে বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান।

‘শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ গঠন’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমানছবি: প্রথম আলো

আজ বৃহস্পতিবার (১৪ নভেম্বর) রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই) আয়োজিত ‘শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ গঠন’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এই সোজাসাপ্টা মন্তব্য করেন।

‘নৈতিক অবক্ষয়’ ও নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তৃণমূল পর্যায়ে সৃষ্ট সহিংসতা ও দখলদারত্বের বিষয়টিকে সামনে এনে সেলিমা রহমান বলেন, দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতার বলয় থেকে দূরে থাকায় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছে। তাদের মধ্যে জেঁকে বসা ‘এবার আমাদের খাওয়ার পালা’ মানসিকতা মূলত নৈতিক অবক্ষয়েরই চরম বহিঃপ্রকাশ। তিনি অকপটে স্বীকার করেন, হাজারো নেতাকর্মীর এই ক্ষোভ ও লোভ সংবরণ করা এবং তাদের সঠিক পথে পরিচালনা করা দলের জন্য এখন কঠিন পরীক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত ১৭ বছরে সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে অবক্ষয় ঢুকেছে, তা রাতারাতি বা একদিনে মেরামত করা অসম্ভব। তবে রাজনৈতিক দলগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর নিরাপত্তা ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বললেও মাদকসহ বিভিন্ন সামাজিক ব্যাধি দেশজুড়ে যে ক্ষত সৃষ্টি করেছে, তার বাস্তব চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

নির্বাচন ও সহিংসতার আশঙ্কা
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে অভিহিত করেন বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচনে সহিংসতার ঝুঁকি রয়েছে। তবে এই ঝুঁকি মোকাবিলার পথও বাতলে দেন তিনি। সেলিমা রহমানের মতে, নির্বাচন কমিশন যদি তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকে, তবে বড় ধরনের সংঘাত ও সহিংসতা এড়ানো সম্ভব হবে।

ভোটাধিকার বঞ্চিত তরুণ প্রজন্ম
বিগত সতেরো-আঠারো বছরে দেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের অনুপস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে দেশে সুস্থ ধারার নির্বাচন না হওয়ায় সাধারণ মানুষ নির্বাচনের প্রকৃত স্বাদ ও অভিজ্ঞতা ভুলতে বসেছে। বিশেষ করে, তরুণ প্রজন্মের বিশাল একটি অংশ তাদের জীবনে একবারও ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। এই ‘ভোটবঞ্চিত’ প্রজন্মের কাছে গণতন্ত্রের চর্চা ফিরিয়ে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

নির্বাচিত সরকারের অপরিহার্যতা ও সংস্কার
সেলিমা রহমান জোর দিয়ে বলেন, সহিংসতার আশঙ্কা থাকলেও দেশে একটি নির্বাচনের আয়োজন অপরিহার্য। কারণ, রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল সংস্কার, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এবং একটি জবাবদিহিমূলক প্রশাসন নিশ্চিত করতে হলে নির্বাচিত সরকারের কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে একটি জবাবদিহিমূলক সরকার গঠিত হলে বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে সমাজ পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হবে। যদিও এই পরিবর্তন আনতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে, তবুও সেই পথেই দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।

আন্দোলনে নারী ও বর্তমান বাস্তবতা
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে নারীদের সক্রিয় ও সাহসী ভূমিকার প্রশংসা করলেও সেলিমা রহমান হতাশা প্রকাশ করেন তাদের বর্তমান অবস্থান নিয়ে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, আন্দোলনে নারীরা সামনে থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে কেন তারা নেতৃত্বের অগ্রভাগে থাকতে পারছে না? শিক্ষিত সমাজের মধ্যেও নারীর ক্ষমতায়ন ও অবস্থান নিয়ে এক ধরনের অন্ধকার বা জড়তা রয়ে গেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

গোলটেবিল বৈঠকের অন্যান্য প্রসঙ্গ
বিইআই-এর সভাপতি ও সাবেক কূটনীতিক এম. হুমায়ুন কবিরের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই আলোচনায় স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনী ভাবনা নিয়ে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন বিইআই-এর সহকারী পরিচালক নিপা রানী।

অনুষ্ঠানে সম্মানীয় অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মলার। এছাড়া আলোচনায় আরও অংশ নেন প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য তাসলিমা আখতার, এবি পার্টির নারী উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক ফারাহ নাজ সাত্তার এবং এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ফয়সাল মাহমুদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts