১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ৪ঠা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৪ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৩:০৫ বুধবার বসন্তকাল
সাংবাদিকতাকে কেবল জীবিকার মাধ্যম হিসেবে না দেখে একে একটি নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছেন দেশের জ্যেষ্ঠ সম্পাদক ও যায়যায়দিন-এর প্রতিষ্ঠাতা শফিক রেহমান। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সাংবাদিকতায় প্রকৃত স্বাধীনতা ও মেরুদণ্ড সোজা রাখতে হলে একজন গণমাধ্যমকর্মীর জন্য আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বনির্ভরতা অর্জন করা জরুরি। অন্যথায় আপসের ফাঁদে পড়ে ‘দালাল’ হিসেবে অভিযুক্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

শনিবার (আজ) সকালে রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে আয়োজিত ‘গণমাধ্যম সম্মিলন ২০২৬’-এ বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) এবং সম্পাদক পরিষদ যৌথভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পক্ষে এই সম্মিলনের আয়োজন করে।
স্বাধীনতার পূর্বশর্ত: আর্থিক স্বাবলম্বন
শফিক রেহমান তাঁর বক্তব্যে পেশাগত স্বাধীনতার সমীকরণে ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তিনি তরুণ ও কর্মরত সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, কেবল সাংবাদিকতার আয়ের ওপর শতভাগ নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। এর ফলে অনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে হয়। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতাটুকু আপনাকেই অর্জন করতে হবে। যদি আপনি সাংবাদিকতার ওপর অত্যধিক নির্ভর করেন, তবে একদিন আপনাকে “দালাল” অপবাদ শুনতে হতে পারে।’
এই পরিস্থিতি এড়াতে তিনি সাংবাদিকদের বিকল্প পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি শিক্ষকতা, গবেষণা বা অর্থনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জন করলে কারও দয়ার ওপর নির্ভর করতে হবে না এবং সত্য বলার সাহস অটুট রাখা সম্ভব হবে বলে তিনি মত দেন।
রাজনীতির ‘ম্যাজিক’ ও ভোল পাল্টানো সাংবাদিকতা
সমসাময়িক সাংবাদিকতার নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরতে গিয়ে শফিক রেহমান তীব্র শ্লেষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কিছু সাংবাদিকের ভোল পাল্টানোর বিষয়টি বিস্ময়কর।
তিনি বলেন, ‘যাঁরা কিছুদিন আগেও আওয়ামী লীগের পক্ষে ছিলেন, তাঁরাই এখন সব বিএনপির পক্ষে কথা বলছেন। এটা কি কোনো ম্যাজিক? আপনারা কেন এই ম্যাজিকে বা পাল্লায় পড়বেন? এতে আপনাদের সম্মান বাড়ছে না, বরং আপনারা হাস্যকর হচ্ছেন।’ সাংবাদিকদের ‘দালাল’ বলা হলে নিজের দুঃখবোধের কথাও তিনি অকপটে স্বীকার করেন।
ব্যক্তিপূজা বনাম প্রাতিষ্ঠানিকতা
বক্তব্যে ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা করেন এই প্রবীণ সম্পাদক। তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তির নামের আগে অহেতুক বিশেষণ ব্যবহার বা তোষামোদি তিনি পছন্দ করেন না। ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠানের কাজ এবং আদর্শকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সম্পাদকের কাজ কেবল কথা বলা নয়, বরং চিন্তা করা ও লেখা। তিনি নিজেকে বক্তার চেয়ে লেখক হিসেবেই পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
কারাবাস ও শারীরিক ত্যাগের স্মৃতিচারণা
নিজের দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় জীবনের অভিজ্ঞতার ঝুলি খুলে ধরেন শফিক রেহমান। ১৯৭৪ সালে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া এবং লন্ডনে দীর্ঘ ২৯ বছরের নির্বাসিত জীবনের কথা স্মরণ করেন তিনি। লন্ডনে ব্রিটিশ গণমাধ্যমে কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেও তিনি সচেতনভাবে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে চলেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে নিজের ওপর বয়ে যাওয়া নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি জানান, জেলখাটতে গিয়ে তিনি তাঁর বাম চোখ এবং বাম কানের শ্রবণশক্তি হারিয়েছেন। বর্তমানে ডান কানেও তিনি কম শোনেন এবং ডান চোখে মাত্র ৫০ শতাংশ দেখতে পান। কানে হিয়ারিং এইড লাগিয়ে কথা বলছেন জানিয়ে তিনি বলেন, এত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি মতপ্রকাশ থেকে পিছু হটেননি।
অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাত নিয়ে উদ্বেগ
সাংবাদিকতার বাইরে দেশের অর্থনীতি নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেন শফিক রেহমান। তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকিং ও মুদ্রানীতিতে দীর্ঘদিনের ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হচ্ছে এখন। মানুষ অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচতে সোনার দিকে ঝুঁকছে, যা অর্থনীতির জন্য শুভলক্ষণ নয়। তিনি একটি শক্তিশালী ও মানসম্মত ব্যাংকিং কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।
স্ট্যান্ডার্ড কমিটি গঠনের প্রস্তাব
সাংবাদিকতা পেশার হৃত মর্যাদা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সাংবাদিকদেরই নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন শফিক রেহমান। এ জন্য তিনি সংবাদপত্রের মান নিয়ন্ত্রণ ও পেশাগত নীতিমালা ঠিক রাখতে একটি ‘স্ট্যান্ডার্ড কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব দেন।
সম্মিলনে দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পেশাগত মর্যাদা সমুন্নত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। এ সময় নোয়াব, সম্পাদক পরিষদ, অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স (অ্যাটকো), জাতীয় প্রেসক্লাব, বিএফইউজে, ডিইউজেসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতা, সম্পাদক, প্রকাশক ও কলাম লেখকরা উপস্থিত ছিলেন।
Analysis | Habibur Rahman
