.
আন্তর্জাতিক

দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সেনা: চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নতুন ছক? | US-South Korea Military Alliance

Email :42

১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ১:৩৬ সোমবার বসন্তকাল

কয়েক দশক ধরে উত্তর কোরীয় হুমকি মোকাবেলাই ছিল দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েনকৃত মার্কিন সেনাদের একমাত্র পরিচয়। কিন্তু সিউল সফরে এসে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হ্যাগসেথের একটি মন্তব্য সেই সনাতন ধারণাকে নাড়িয়ে দিয়েছে, যা পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক দাবা খেলায় এক নতুন চালের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

কৌশলগত পুনর্বিন্যাস: ‘নমনীয়তা’র আড়ালে নতুন বার্তা

মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর, ২০২৫) সিউলে দক্ষিণ কোরীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আন গিউ-ব্যাকের সাথে বৈঠকের পর মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হ্যাগসেথ স্পষ্ট করেন যে, কোরীয় উপদ্বীপে থাকা ২৮,৫০০ মার্কিন সেনাকে আঞ্চলিক সংকট মোকাবেলায় ব্যবহার করা হতে পারে। তার মতে, উত্তর কোরিয়াকে প্রতিরোধ করা জোটের ‘প্রধান লক্ষ্য’ থাকলেও, আঞ্চলিক সংকট মোকাবেলায় এই সেনাদের ব্যবহারের ‘নমনীয়তা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।

বিশ্লেষকরা এই ‘নমনীয়তা’ শব্দটিকে ওয়াশিংটনের কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের মূল চাবিকাঠি হিসেবে দেখছেন। এর অর্থ, প্রয়োজন পড়লে তাইওয়ান প্রণালী বা দক্ষিণ চীন সাগরের মতো উত্তেজনাকর অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবেলায় এই সেনাদের ব্যবহার করা হতে পারে। এটি দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য একটি অস্বস্তিকর বার্তা, কারণ দেশটি ঐতিহাসিকভাবে মার্কিন সেনাদের ভূমিকা শুধু উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধেই সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছে।

সিউলের দ্বিমুখী নীতি: বাজেট বৃদ্ধি ও আত্মনির্ভরতার পথে যাত্রা

ওয়াশিংটনের এই নতুন ভাবনার জবাবে সিউলও তার দ্বিমুখী নীতি স্পষ্ট করেছে। একদিকে যখন মার্কিন সেনাদের ভূমিকার পরিবর্তনে উদ্বেগ রয়েছে, ঠিক তখনই নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে কোমর বেঁধে নেমেছে দেশটি।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মায়ুং দেশের প্রতিরক্ষা বাজেট রেকর্ড ৮.২ শতাংশ বাড়িয়ে ৪৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছেন। ছয় বছরের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ বাজেট বৃদ্ধি। এর মাধ্যমে সিউল স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তারা নিজেদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। একইসাথে, যুদ্ধকালীন সময়ে মিত্র বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতেও তারা আগ্রহী।

প্রতিরক্ষার নতুন ক্ষেত্র: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

এই সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়া প্রযুক্তির ময়দানেও এক বিরাট লাফ দিতে চলেছে। দেশটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) খাতে বিনিয়োগ তিনগুণ বাড়িয়ে ৭ বিলিয়ন ডলার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের লক্ষ্য, আমেরিকা ও চীনের পাশাপাশি বিশ্বের শীর্ষ তিনটি AI শক্তির একটিতে পরিণত হওয়া। এই বিপুল বিনিয়োগ শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য নয়, বরং আধুনিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের একটি সুস্পষ্ট প্রয়াস।

সব মিলিয়ে, পিট হ্যাগসেথের সিউল সফর শুধু একটি রুটিন বৈঠক ছিল না। এটি ছিল মার্কিন-দক্ষিণ কোরিয়া জোটের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, যেখানে উত্তর কোরিয়ার পুরনো হুমকির পাশাপাশি চীনের নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার একটি রূপরেখা তৈরি হচ্ছে। এই কৌশলগত পরিবর্তন কি কোরীয় উপদ্বীপকে আরও সুরক্ষিত করবে, নাকি পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার এক নতুন ক্ষেত্রে পরিণত করবে—সেই উত্তর দেবে ভবিষ্যতই।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts