১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সন্ধ্যা ৭:২২ সোমবার বসন্তকাল
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিগত দেড় দশকের নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের অনাস্থা কাটিয়ে এবারের নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। তবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও সংবিধানের সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, চাইলেই দেশের সব নাগরিক এবার প্রার্থী হতে বা ভোট দিতে পারবেন না। বিশেষ করে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতায় আনা হয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।

প্রার্থী হওয়ার পথে নতুন বাধা ও পুরোনো শর্ত
সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া এবং ন্যূনতম ২৫ বছর বয়স পূর্ণ করা প্রার্থী হওয়ার প্রাথমিক শর্ত। তবে এবার আরপিও (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ) সংশোধনের মাধ্যমে কিছু কঠোর নিয়ম যুক্ত করা হয়েছে।
সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী, আদালত কর্তৃক ‘ফেরারি’ বা ‘পলাতক’ ঘোষিত কোনো আসামি এখন থেকে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। এছাড়া সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বা অন্য কোনো পদে থাকলেও তিনি নির্বাচনে অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার স্পষ্ট করেছেন যে, সরকারের লাভজনক পদে (যেমন প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী) থেকে এবার কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।
এর বাইরেও প্রচলিত আইনি বাধাগুলো বহাল থাকছে:
- সরকারি বা সামরিক চাকরি থেকে অবসর বা পদত্যাগের পর ৩ বছর পূর্ণ না হলে প্রার্থী হওয়া যাবে না।
- দুর্নীতির দায়ে চাকরিচ্যুত হলে ৫ বছর অপেক্ষার সময়কাল পার করতে হবে।
- বিদেশি অনুদানপুষ্ট এনজিও-র শীর্ষ পদে থাকলে বা পদত্যাগের ৩ বছরের মধ্যে নির্বাচনে আসা যাবে না।
- ঋণখেলাপি, ঋণের জামিনদার এবং সরকারের বিভিন্ন সেবা খাতের (গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি) বিল বকেয়া থাকলে প্রার্থিতা বাতিল হবে।
- দ্বৈত নাগরিকরা ভোটার হতে পারলেও বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী তারা সংসদ সদস্য পদে লড়তে পারবেন না।
কারা হারাচ্ছেন ভোটাধিকার?
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী দেশে মোট ভোটার প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ। ১৮ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের নাগরিকরা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। প্রথমবারের মতো প্রবাসীরা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন এবং কারাগারে থাকা বন্দিরাও ভোট দিতে পারবেন।
তবে ভোটার তালিকা আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু কারণে নাগরিকরা ভোটাধিকার হারাতে পারেন:
১. ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত ব্যক্তি: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে কেউ দোষী সাব্যস্ত হলে তার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে। গত ১৭ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড এবং সাবেক পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে কারাদণ্ড দিয়েছে। আগামী ১৭ ডিসেম্বরের মধ্যে আপিল না করলে আইন অনুযায়ী তারা ভোটাধিকার হারাবেন এবং প্রার্থী হওয়ারও অযোগ্য হবেন।
২. মানসিক ভারসাম্যহীন: উপযুক্ত আদালত যদি কাউকে অপ্রকৃতিস্থ ঘোষণা করে।
৩. দেউলিয়া: আদালত কর্তৃক দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার পর দায় থেকে অব্যাহতি না পেলে।
৪. নাগরিকত্ব ত্যাগ: কেউ স্বেচ্ছায় বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে বা আনুগত্য প্রকাশ করলে বাংলাদেশের ভোটার হিসেবে অযোগ্য হবেন।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে আইনি কাঠামো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত বা পলাতক ব্যক্তিরা রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে না পারেন।
Analysis | Habibur Rahman
