১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ১:৪৪ বৃহস্পতিবার শীতকাল
ডিজিটাল দুনিয়ায় ‘বাকস্বাধীনতা’ বনাম ‘বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ’—এই দুই ভিন্ন মতাদর্শের সংঘাতে এবার সরাসরি কূটনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ল যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পাঁচজন বিশিষ্ট ইউরোপীয় নাগরিকের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর আটলান্টিকের দুই পাড়ের সম্পর্ক এখন তলানিতে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁসহ ইউরোপীয় শীর্ষ নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে ‘ভীতি প্রদর্শন’ এবং ‘সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত’ হিসেবে অভিহিত করে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ: ‘বাকস্বাধীনতা দমনের’ আন্তর্জাতিক চক্র
গত মঙ্গলবার এক আকস্মিক ঘোষণায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যুক্তরাজ্যের ‘সেন্টার ফর কাউন্টারিং ডিজিটাল হেট’ (সিসিডিএইচ)-এর প্রধান ইমরান আহমেদসহ পাঁচ ইউরোপীয় নাগরিকের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। রুবিওর অভিযোগ, এই ব্যক্তিরা এবং তাঁদের সংগঠনগুলো বিশ্বজুড়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর (যেমন—মেটা, এক্স) ওপর চাপ সৃষ্টি করে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের স্বাধীন মতামতের কণ্ঠরোধ করা।
রুবিও বলেন, “বিদেশি কোনো নাগরিক বা গোষ্ঠী যদি মার্কিন কোম্পানির ওপর খবরদারি করে আমাদের দেশের নাগরিকদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করে, তবে ট্রাম্প প্রশাসন তা কোনোভাবেই মেনে নেবে না। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি অনুযায়ী, আমরা আমাদের জনগণের বাকস্বাধীনতা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
মার্কিন প্রশাসন এই পাঁচ ব্যক্তিকে ‘উগ্রপন্থী অধিকারকর্মী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বিদ্বেষ ছড়ানোর’ অজুহাতে রক্ষণশীল মার্কিনদের মতামতকে সেন্সরশিপের আওতায় আনতে চায়।
ইউরোপের তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের পর ইউরোপজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বিষয়টিকে নজিরবিহীন উল্লেখ করে বলেন, “এটি মিত্র দেশের নাগরিকদের প্রতি স্পষ্ট ভীতি প্রদর্শন।”
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা ক্যালাস আরও কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “এটি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং ইউরোপের ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত। ইন্টারনেটে নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়ার প্রচেষ্টাকে এভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায় না।”
যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রযুক্তিবিষয়ক সিলেক্ট কমিটির চেয়ারম্যান ও লেবার পার্টির জ্যেষ্ঠ এমপি চি অনভুরাহ ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, “যারা অনলাইনে বিদ্বেষ ও ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়া রোধে কাজ করছেন, তাদের নিষিদ্ধ করা হাস্যকর। ট্রাম্প প্রশাসন বাকস্বাধীনতা রক্ষার কথা বলে আদতে ভিন্নমতের মানুষদেরই বাকস্বাধীনতা হরণ করছে।”
চি অনভুরাহ আরও উল্লেখ করেন, ডিজিটাল জগতে বিদ্বেষপূর্ণ আচরণের কারণে অসংখ্য মানুষ মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই ইমরান আহমেদের মতো প্রচারকর্মীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
ব্রিটিশ সরকারের সতর্ক অবস্থান
নেতাদের কড়া সমালোচনার মুখেও যুক্তরাজ্যের সরকার কিছুটা কূটনৈতিক ও সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছে। ব্রিটিশ সরকারের এক মুখপাত্র জানান, “প্রতিটি দেশের নিজস্ব ভিসা নীতি নির্ধারণের অধিকার রয়েছে। তবে যুক্তরাজ্য সরকার ইন্টারনেটকে ক্ষতিকর কনটেন্টমুক্ত রাখতে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশে আছে এবং বাকস্বাধীনতা রক্ষায় পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
নিষিদ্ধ হলেন যারা
ট্রাম্প প্রশাসনের কালোতালিকায় স্থান পাওয়া পাঁচ ব্যক্তি হলেন:
১. ইমরান আহমেদ: প্রধান, সেন্টার ফর কাউন্টারিং ডিজিটাল হেট (যুক্তরাজ্য)।
২. ক্লেয়ার মেলফোর্ড: প্রধান নির্বাহী, গ্লোবাল ডিজইনফরমেশন ইনডেক্স।
৩. থিয়েরি ব্রেতোঁ: ইউরোপীয় কমিশনের সাবেক প্রভাবশালী কমিশনার, যিনি আগে ইলন মাস্কের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়েছিলেন।
৪. আনা-লেনা ফন হোডেনবার্গ: জার্মান সংস্থা হেটএইড-এর কর্মকর্তা।
৫. জোসেফিন ব্যালন: জার্মান সংস্থা হেটএইড-এর কর্মকর্তা।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—সিলিকন ভ্যালির ব্যবসায়িক স্বার্থ নাকি ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীতি—এই নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সেই লড়াই এক নতুন ও বিপজ্জনক মোড় নিল।
Analysis | Habibur Rahman
