১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৫:৪৭ সোমবার বসন্তকাল
দীর্ঘ জল্পনাকল্পনা ও নানা নাটকীয়তার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ঝিনাইদহের চারটি সংসদীয় আসনে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে বিএনপি। তবে মনোনয়ন প্রক্রিয়া শেষ হলেও থামেনি উত্তাপ। বিশেষ করে ঝিনাইদহ-৪ আসনে গণ অধিকার পরিষদের সদ্য সাবেক নেতা রাশেদ খাঁনকে বিএনপির মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে দলের ভেতরেই সৃষ্টি হয়েছে তীব্র অসন্তোষ। এর জেরে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম (ফিরোজ)।
অন্যদিকে, বিএনপিতে যখন প্রার্থী বাছাই নিয়ে জটিলতা চলছে, তখন বেশ আগেভাগেই প্রার্থী ঘোষণা করে মাঠে সরব রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। যাচাই-বাছাই শেষে জেলার চারটি আসনে এখন মোট ২৩ জন প্রার্থী নির্বাচনী লড়াইয়ে টিকে রইলেন।
রাশেদকে নিয়ে নাটক ও ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিদ্রোহ
ঝিনাইদহ-৪ (সদর উপজেলার আংশিক ও কালীগঞ্জ) আসনটি বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত এটি বিএনপির প্রয়াত সাংসদ এম শহীদুজ্জামানের দখলে ছিল। এবার এই আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন তিনজন—স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা সাইফুল ইসলাম, কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক হামিদুল ইসলাম এবং প্রয়াত এম শহীদুজ্জামানের স্ত্রী মুর্শিদা জামান।
তবে ঘটনার মোড় নেয় অন্যদিকে। গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁন প্রথমে জোটগতভাবে মনোনয়ন পেলেও পরে বিএনপিতে যোগ দেওয়ায় তাকেই ধানের শীষের চূড়ান্ত প্রার্থী করা হয়। রাশেদ খাঁন পাশের আসনের বাসিন্দা হওয়ায় এবং স্থানীয় নেতাদের বাদ দিয়ে তাকে মনোনয়ন দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হন ১৭ বছর ধরে দলের জন্য কাজ করা সাইফুল ইসলাম।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া সাইফুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, “যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তিনি এই এলাকার ভোটার বা বাসিন্দা নন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নেই। তৃণমূলের আবেগকে উপেক্ষা করায় আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছি এবং জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।”
এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন কালীগঞ্জ উপজেলা নায়েবে আমির মাওলানা আবু তালেব। এছাড়া গণফোরামের কনিকা খানম ও ইসলামী আন্দোলনের আবদুল জলিলও ভোটের মাঠে রয়েছেন। এখানে তিনজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে।
ঝিনাইদহ-২: রাশেদের প্রস্থান ও মজিদের মনোনয়ন
ঝিনাইদহ-২ (সদর ও হরিণাকুণ্ডু) আসনে শুরুতে রাশেদ খাঁনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আবহ তৈরি হয়েছিল। ৫ আগস্টের পর কেন্দ্র থেকে স্থানীয় বিএনপিকে রাশেদ খাঁনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার নির্দেশ দেওয়া হয়। তিনিও সভা-সমাবেশ শুরু করেছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তাকে ঝিনাইদহ-৪ আসনে সরিয়ে দেওয়ায় কপাল খোলে জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ মজিদের।
এই আসনে প্রয়াত সাংসদ মশিউর রহমানের ছেলে ইব্রাহিম রহমান মনোনয়ন চাইলেও দল শেষ পর্যন্ত জেলা সভাপতিকেই বেছে নিয়েছে। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান জানান, আসনটি পুনরুদ্ধারে তারা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন।
এখানে জামায়াতের প্রার্থী জেলা আমির অধ্যাপক আলী আযম মো. আবু বক্কর। তিনি নিজের জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। এছাড়া বাম জোট, ইসলামী আন্দোলন, এবি পার্টি এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের প্রার্থীরাও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ঝিনাইদহ-১: হেভিওয়েট প্রার্থীর লড়াই
ঝিনাইদহ-১ (শৈলকুপা) আসনে ১৯৯১ সালের পর বিএনপি আর জয়লাভ করতে পারেনি। এবার আসনটি পুনরুদ্ধারে সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানকে মনোনয়ন দিয়েছে দলটি। দেশের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তার পদ ছেড়ে এলাকার উন্নয়নে কাজ করতে চাওয়া আসাদুজ্জামানকে নিয়ে আশাবাদী স্থানীয় বিএনপি। শৈলকুপা উপজেলা বিএনপির সভাপতি হুমায়ন কবির ফিরোজ জানান, দলে এখন কোনো ভেদাভেদ নেই, সবাই আসাদুজ্জামানের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ।
এখানে জামায়াতের প্রার্থী উপজেলা আমির মতিউর রহমান। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী নূর আলম বিশ্বাস ঋণখেলাপির দায়ে যাচাই-বাছাইয়ে বাদ পড়েছেন। এছাড়া এবি পার্টি, এনসিপি ও বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থীরা ভোটের মাঠে রয়েছেন।
ঝিনাইদহ-৩: উত্তরাধিকার বনাম সাংগঠনিক শক্তি
ঝিনাইদহ-৩ (কোটচাঁদপুর ও মহেশপুর) আসনে ১৯৯১ সাল থেকে টানা তিনবারের এমপি প্রয়াত শহিদুল ইসলামের ছেলে মেহেদী হাসান রনিকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। তিনি মহেশপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি।
তবে এখানে জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। জামায়াতের প্রার্থী কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য মো. মতিয়ার রহমান বেশ আগে থেকেই প্রচারে রয়েছেন। গণ অধিকার পরিষদ জেলার চারটি আসনের মধ্যে একমাত্র এই আসনেই তাদের প্রার্থী মো. সুমন কবিরকে দাঁড় করিয়েছে।
ঝিনাইদহের চারটি আসনে মোট ২৭ জন মনোনয়নপত্র জমা দিলেও যাচাই-বাছাই শেষে এখন প্রার্থী রয়েছেন ২৩ জন। জাতীয় পার্টি তিনটি আসনে প্রার্থী দিলেও তাদের তেমন কোনো তৎপরতা নেই। এবি পার্টি ও বাম জোটের উপস্থিতি সীমিত। মূল লড়াইটা বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী এবং বহিরাগত ইস্যু ভোটের সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
Analysis | Habibur Rahman
