.
অন্যান্য

জুলাই বিপ্লবের পর নতুন লড়াই: ‘কালচারাল ফ্যাসিস্ট’দের বিরুদ্ধে সাদিক কায়েমের হুশিয়ারি।

Email :80

১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৩:৪৫ সোমবার বসন্তকাল

জুলাই বিপ্লবের ধুলো যখন থিতিয়ে আসছে, তখন ঢাকার রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে এক নতুন পরিভাষা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে—‘কালচারাল ফ্যাসিবাদ’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েমের কণ্ঠে বারবার উচ্চারিত এই শব্দটি জানান দিচ্ছে, ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও আদর্শিক লড়াই এখনও থামেনি। তার মতে, এই অদৃশ্য শত্রুকে প্রতিরোধ করতে না পারলে অর্জিত স্বাধীনতা আবারও বিপন্ন হতে পারে।
ফ্যাসিবাদকে কেবল রাজনৈতিক কাঠামোতে সীমাবদ্ধ না রেখে সাদিক কায়েম এর সাংস্কৃতিক শেকড়ের দিকেই আঙুল তুলেছেন। তার মতে, রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে একটি দলকে সরানো গেলেও, বহু বছর ধরে তাদের গড়া সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বলয়টি এখনও সক্রিয়। ৩০ জুলাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই অদৃশ্য শক্তিকে চিহ্নিত করে বলেন, “কালচারাল ফ্যাসিস্টরা এখনো আগের মতোই সক্রিয়। তাদের সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান থেকে না সরালে ফ্যাসিবাদ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে।” তার বক্তব্যে ‘মুজিববাদ’ এবং ‘কালচারাল এস্টাবলিশমেন্ট’-এর প্রভাবকে দেশের সাংস্কৃতিক পরিসরের জন্য হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

এই ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ’-এর ঐতিহাসিক ভিত্তি হিসেবে তিনি ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠার সহিংসতাকে মূল কারণ হিসেবে দেখছেন। ডাকসু আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, “২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকেই শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশে ফ্যাসিবাদের বীজ বপন হয়।” তার মতে, সেদিনকার রাজপথের হত্যাকাণ্ড ছিল নিছক রাজনৈতিক সংঘাত নয়, বরং একটি মতাদর্শিক সন্ত্রাসের সূচনা, যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপদ নয়।

তাত্ত্বিক আলোচনার পাশাপাশি এই আদর্শিক লড়াইকে মাঠ পর্যায়ে নিয়ে যেতে সাদিক কায়েম “জুলাই জাগরণ ও কালচারাল ফেস্ট”-এর মতো কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। এই উৎসবের লক্ষ্য কেবল বিপ্লব উদযাপন নয়, বরং গত ১৬ বছরের শাসনামলে ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষের ওপর ঘটা নির্যাতন, গুম, খুন এবং “আয়নাঘর”-এর মতো নিপীড়নের কেন্দ্রগুলোর অন্ধকার ইতিহাসকে শিল্পের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা।

তার রাজনৈতিক অবস্থানও এখানে স্পষ্ট। তিনি শেখ হাসিনা এবং তার নেতৃত্বাধীন দলগুলোকে “সন্ত্রাসী সংগঠন” আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশে তাদের রাজনীতি করার অধিকারকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন।

সবশেষে, এই আদর্শিক সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে সাদিক কায়েম একটি નક્কার দাবি উত্থাপন করেছেন—আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল। তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, ২৮ অক্টোবরের সহিংসতা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ের বিচারিক হত্যাকাণ্ড এবং বেগম জিয়াসহ বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতনের দায়ে শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিচারের মুখোমুখি করতে যেন একটি আন্তর্জাতিক মানের বিচারিক কাঠামো গঠন করা হয়।
সাদিক কায়েমের এই অবস্থান থেকে এটি স্পষ্ট যে, দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরই যথেষ্ট নয়। তার এই বক্তব্য এক গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী সাংস্কৃতিক এবং আদর্শিক শুদ্ধি অভিযানের ইঙ্গিত দেয়। তার এই নতুন বয়ান রাজনীতিতে ‘শত্রু-মিত্র’ চিহ্নিত করার এক নতুন মানদণ্ড তৈরি করছে, যা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের লড়াই এখন রাজপথ ছাড়িয়ে সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং আদর্শের ময়দানে প্রবেশ করেছে।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts