১০ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২৪শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ৪ঠা শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি রাত ২:০৯ মঙ্গলবার বসন্তকাল
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাক করার অভিযোগে গ্রেফতারকৃত বঙ্গভবনের সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলমকে জামিন দিয়েছেন আদালত। আজ বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জুনাইদ উভয় পক্ষের শুনানি শেষে এই আদেশ প্রদান করেন।
রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ আইনে দায়ের করা এ মামলায় তাকে আদালতে তোলা হলে দিনভর নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

আদালতে যা হলো
বৃহস্পতিবার দুপুরে ছরওয়ারে আলমকে কারাগার থেকে ঢাকার সিএমএম আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হাতিরঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) খন্দকার সালেহ আবু নাঈম তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আসামিকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন জানান। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. আলমগীর জামিন চেয়ে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেন।
জামিন শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেন, ‘আমার মক্কেলকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং হয়রানির উদ্দেশ্যে আটক করা হয়েছে। তিনি ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নন। যেহেতু তিনি সরকারি চাকরিজীবী এবং তার স্থায়ী ঠিকানা ও পরিবার রয়েছে, তাই জামিন পেলে তার পলাতক হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। আমরা যেকোনো শর্তে তার জামিন প্রার্থনা করছি।’
অন্যদিকে, বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. আবদুর রাজ্জাক জামিনের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি আদালতের উদ্দেশে বলেন, ‘আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। তার মোবাইল ফোনের প্রাথমিক ফরেনসিক রিপোর্টেও সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। নির্বাচনের আগমুহূর্তে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও উসকানি সৃষ্টির লক্ষ্যেই এ ধরনের সাইবার অপরাধ করা হয়েছে। এমতাবস্থায় তাকে জামিন দেওয়া হলে তদন্ত বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’
কাঠগড়ায় আসামির আবেগঘন বক্তব্য
শুনানির একপর্যায়ে বিচারক সরাসরি আসামির কাছে জানতে চান, তার কিছু বলার আছে কি না। এ সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজেকে ‘শতভাগ নির্দোষ’ দাবি করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ছরওয়ারে আলম।
তিনি আদালতকে বলেন, ‘মাননীয় আদালত, আমি চাকরির শেষ বয়সে এসে উপনীত হয়েছি। আমার সামনে অবসর এবং পেনশন। এই বয়সে এসে সামান্য হ্যাকিংয়ের মতো কাজ করে আমি কি আমার সারাজীবনের অর্জিত পেনশন নষ্ট করব? আমার পরিবার আছে, সম্মান আছে। আমি তদন্ত কর্মকর্তাকে বারবার বলেছি, আমি কিছুই করিনি।’
নিজের সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে গিয়ে বঙ্গভবনের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে আমি স্বেচ্ছায় আমার ব্যক্তিগত ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি। আমার হাত দিয়ে কখনো কোনো খারাপ কাজ হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হবে না। আমি ষড়যন্ত্রের শিকার।’
উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত সার্বিক বিবেচনায় তার জামিন মঞ্জুর করেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
গত শনিবার বিকেলে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নারীদের নিয়ে একটি অবমাননাকর মন্তব্য ইংরেজিতে পোস্ট করা হয়। মুহূর্তেই সেই পোস্টটি ভাইরাল হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। তবে ঘটনার পরপরই জামায়াতের পক্ষ থেকে অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয় যে, আমিরের অ্যাকাউন্টটি সাইবার হামলার শিকার হয়েছে এবং ওই বিতর্কিত পোস্টটি তাদের নয়।
এ ঘটনায় জামায়াতের পক্ষ থেকে হাতিরঝিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়, যা পরবর্তীতে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলায় রূপ নেয়। তদন্তে নেমে প্রযুক্তির সহায়তায় মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস অডিটরিয়াম সংলগ্ন সরকারি কোয়ার্টার থেকে ছরওয়ারে আলমকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ সময় তার ব্যবহৃত ডিজিটাল ডিভাইসগুলোও জব্দ করা হয়।
আজ জামিন লাভের মধ্য দিয়ে আপাতত কারামুক্ত হলেন বঙ্গভবনের এই সহকারী প্রোগ্রামার। তবে মামলার তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
Analysis | Habibur Rahman