১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৩:৪৬ সোমবার বসন্তকাল
চীনের সামরিক বাহিনীর অন্দরমহলে চলছে বড় ধরণের তোলপাড়। দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) শীর্ষ নেতৃত্বে নেমে এসেছে আকস্মিক বিপর্যয়। দেশটির দুই শীর্ষ জেনারেলকে বরখাস্ত করার ঘটনা বেইজিংয়ের অভিজাত মহলে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং সামরিক বাহিনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

নেতৃত্বশূন্য সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন
চীনের সশস্ত্র বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণকারী সর্বোচ্চ সংস্থা ‘সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন’ (সিএমসি)-তে আক্ষরিক অর্থেই ধস নেমেছে। সাধারণত সাত সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত এই শক্তিশালী বডিটি বর্তমানে মাত্র দুই সদস্যে এসে ঠেকেছে। গত সপ্তাহান্তে কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান ও শীর্ষ জেনারেল ঝাং ইউকসিয়া এবং অপর জ্যেষ্ঠ জেনারেল লিউ ঝেনলিকে বরখাস্ত করার পর কমিশনে এখন টিকে আছেন কেবল স্বয়ং প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এবং জেনারেল ঝাং শেংমিন।
এর আগে দুর্নীতির অভিযোগে কমিশনের অন্য সদস্যদেরও ধাপে ধাপে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের লাইল মরিসের মতে, সিএমসি-তে সদস্য সংখ্যা এভাবে কমে যাওয়া এবং প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মাত্র একজন জেনারেলের অবস্থান করা—চীনের ইতিহাসে একটি অভূতপূর্ব ঘটনা। মরিস বিবিসিকে জানান, “পিএলএ বর্তমানে চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং বাহিনীর ভেতরে বিশাল এক নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়েছে।”
দুর্নীতি নাকি ক্ষমতার লড়াই?
সরকারিভাবে বেইজিং জানিয়েছে, বরখাস্তকৃত জেনারেলদের বিরুদ্ধে ‘শৃঙ্খলা ও আইনের গুরুতর লঙ্ঘন’-এর তদন্ত চলছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ভাষায় এটি দুর্নীতির অভিযোগের একটি মার্জিত রূপ। সেনাবাহিনীর মুখপত্র ‘পিএলএ ডেইলি’র এক সম্পাদকীয়তে এই পদক্ষেপকে পার্টির ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রতিফলন হিসেবে দাবি করা হয়েছে। সেখানে বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ‘কমিউনিস্ট পার্টির বিশ্বাসের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা’ এবং ‘সিএমসিকে অবমাননা’ করার মতো কঠোর শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, দৃশ্যত দুর্নীতির অভিযোগ আনা হলেও এর নেপথ্যে রয়েছে ক্ষমতার এক জটিল সমীকরণ। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের সহযোগী অধ্যাপক চং জা ইয়ানের মতে, বেইজিংয়ে তথ্যের প্রবাহ অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় প্রকৃত কারণ জানা কঠিন। তবে বাজারে নানা গুঞ্জন রয়েছে—যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পারমাণবিক গোপন তথ্য ফাঁস, অভ্যন্তরীণ উপদলীয় কোন্দল, এমনকি অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের কথাও শোনা যাচ্ছে।
অধ্যাপক ইয়ান বলেন, “এই ঘটনা দুটি বিষয় নিশ্চিত করে: প্রথমত, সি চিন পিংয়ের ক্ষমতা এখনো নিরঙ্কুশ; এবং দ্বিতীয়ত, বেইজিংয়ের অন্দরে কী ঘটছে তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।”
পারিবারিক মিত্র থেকে বিশ্বাসঘাতক?
বরখাস্ত হওয়া জেনারেল ঝাং ইউকসিয়া কেবল একজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সি চিন পিংয়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ঝাংয়ের বাবা এবং সি-এর বাবা ছিলেন একে অপরের বিপ্লবী সহযোদ্ধা। দীর্ঘদিনের পারিবারিক সম্পর্ক এবং সি-এর অনুগত হিসেবে পরিচিত ঝাংয়ের এমন পতন বিশ্লেষকদের অবাক করেছে।
লাইল মরিসের মতে, ঝাং ছিলেন পিএলএ-এর হাতেগোনা কয়েকজন যুদ্ধ-অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার একজন। তাকে সরিয়ে দেওয়া দীর্ঘ মেয়াদে সি চিন পিংয়ের জন্য বুমেরাং হতে পারে। নিজের কর্তৃত্ব জাহির করতে গিয়ে সি হয়তো সামরিক বাহিনীর ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস ও সন্দেহের বীজ বপন করলেন। এখন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে এই ভয় কাজ করবে যে, সি-এর ঘনিষ্ঠ হয়েও যদি ঝাংয়ের শেষরক্ষা না হয়, তবে কেউই নিরাপদ নন।
তাইওয়ান ইস্যু ও যুদ্ধের সক্ষমতা
বেইজিং যখন তাইওয়ানের ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়িয়ে চলেছে এবং দ্বীপটি দখলের হুমকি দিচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বে এমন রদবদল যুদ্ধের প্রস্তুতিতে কী প্রভাব ফেলবে—তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ঝাং ও লিউয়ের মতো অভিজ্ঞ জেনারেলদের অনুপস্থিতি পিএলএ-এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। অধ্যাপক ইয়ান মনে করেন, জেনারেলদের অপসারণ তাইওয়ান দখলের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে হয়তো দমিয়ে রাখবে না, কারণ সেটি সি চিন পিংয়ের একক সিদ্ধান্ত। তবে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে পেশাদারিত্বের অভাব দেখা দিতে পারে।
ভবিষ্যতে তাইওয়ানে অভিযানের সিদ্ধান্ত হয়তো সামরিক কৌশল বা বাস্তবতার চেয়ে সি চিন পিংয়ের ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও মেজাজের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। কারণ, শুদ্ধি অভিযানের ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত নতুন কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার সাহস হয়তো আর দেখাবেন না।
উপসংহার
মাও সেতুং-এর পর সি চিন পিং নিজেকে চীনের সবচেয়ে ক্ষমতাধর একক শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বী বা সন্দেহভাজন কর্মকর্তাদের সরাতে পার্টির ‘শৃঙ্খলা পরিদর্শক দল’কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। তবে সামরিক বাহিনীতে এমন অস্থিরতা এবং আস্থার সংকট চীনের মতো পরাশক্তির জন্য দুর্বলতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। Analysis | Habibur Rahman