.
আন্তর্জাতিক

চাঁদের বুকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: ২০৩৬ সালের মধ্যে রাশিয়ার উচ্চাভিলাসী পরিকল্পনা

Email :37

১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৫:৫০ সোমবার বসন্তকাল

মহাকাশ গবেষণায় হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার এবং পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে এবার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে রাশিয়া। দেশটি ঘোষণা দিয়েছে, আগামী এক দশকের মধ্যে, বিশেষ করে ২০৩৬ সালের সময়সীমার মধ্যে তারা চাঁদের বুকে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করতে চায়। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা হবে মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে মানুষের দীর্ঘস্থায়ী বসবাসের পথে এক বিশাল মাইলফলক।

ফাইল ছবি: রয়টার্স

মস্কোর মহাপরিকল্পনা ও চীন-রাশিয়া যৌথ উদ্যোগ
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মহাকাশ সংস্থা ‘রসকসমস’ সম্প্রতি তাদের এই উচ্চাভিলাসী প্রকল্পের কথা প্রকাশ করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, চাঁদে স্থাপিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি মূলত শক্তি জোগাবে রাশিয়া ও চীনের যৌথ উদ্যোগে নির্মিতব্য ‘ইন্টারন্যাশনাল লুনার রিসার্চ স্টেশন’-এ। এটি কেবল একটি সাধারণ অভিযান নয়, বরং চাঁদের বুকে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় রসদ জোগানোর একটি কৌশল।

রসকসমস জানিয়েছে, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চাঁদে রাশিয়ার নিজস্ব অভিযান, চন্দ্রপৃষ্ঠে বিচরণকারী রোভার এবং বৈজ্ঞানিক মানমন্দিরগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তারা ইতিমধ্যেই ‘লাভোচকিন অ্যাসোসিয়েশন’ নামক একটি মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।

ব্যর্থতা কাটিয়ে নতুন স্বপ্ন
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এবং গত কয়েক দশকে মহাকাশ দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাসা এবং চীনের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিল রাশিয়া। বিশেষ করে ইলন মাস্কের স্পেসএক্স যখন রকেট উৎক্ষেপণে বিপ্লব ঘটিয়েছে, তখন রাশিয়ার একচেটিয়া আধিপত্যে ভাটা পড়ে। এর মধ্যে গত বছরের আগস্টে ‘লুনা-২৫’ মিশনের ব্যর্থতা এবং চাঁদের বুকে মহাকাশযানটি আছড়ে পড়ার ঘটনা রাশিয়ার মহাকাশ কর্মসূচির জন্য ছিল একটি বড় ধাক্কা।

তবে সেই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আরও বড় পরিসরে ফিরে আসছে মস্কো। ইউরি গ্যাগারিনের উত্তরসূরিরা আবারও প্রমাণ করতে চাইছে যে মহাকাশ গবেষণায় তারা এখনো অন্যতম শীর্ষ শক্তি। রসকসমসের মতে, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পটি চাঁদে ক্ষণস্থায়ী অভিযানের যুগ শেষ করে একটি দীর্ঘস্থায়ী বৈজ্ঞানিক গবেষণা যুগের সূচনা করবে।

নেপথ্যে পারমাণবিক শক্তি
রসকসমসের বিবৃতিতে প্রকল্পটিকে সরাসরি ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র’ হিসেবে অভিহিত না করা হলেও, এর নেপথ্যের কারিগরদের নাম সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞে যুক্ত করা হয়েছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি কর্পোরেশন ‘রোসাটম’ এবং বিখ্যাত পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র ‘কুরচাতভ ইনস্টিটিউট’-কে। অর্থাৎ, চাঁদের বুকে শক্তির উৎস হিসেবে পারমাণবিক প্রযুক্তিই যে ব্যবহার করা হবে, তা অনেকটা নিশ্চিত।

এর আগে গত জুন মাসে রসকসমস প্রধান দিমিত্রি বাকানভ জানিয়েছিলেন, তাদের ভবিষ্যৎ লক্ষ্যগুলোর মধ্যে চাঁদে পারমাণবিক রিয়েক্টর স্থাপন এবং পরবর্তীতে পৃথিবীর ‘যমজ বোন’ খ্যাত শুক্র গ্রহে অভিযান পরিচালনা করা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

চাঁদের গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ
পৃথিবী থেকে প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ কিলোমিটার দূরের এই উপগ্রহটি কেবল রাতের আকাশকেই আলোকিত করে না, বরং পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ এবং সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা অপরিসীম। তাই চাঁদে একটি স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করা এবং সেখানে শক্তির উৎস নিশ্চিত করা কেবল রাশিয়ার জন্যই নয়, সমগ্র মানবজাতির মহাকাশ গবেষণার জন্য একটি গেম-চেঞ্জার হতে পারে।

রাশিয়ার এই ঘোষণা মহাকাশ প্রতিযোগিতায় নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ২০৩৬ সালের মধ্যে চাঁদের মাটিতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের এই জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মস্কো কতটুকু সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারে।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts