১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি রাত ১২:২৪ বৃহস্পতিবার শীতকাল
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একইসঙ্গে সংস্কারমূলক ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। হাতে সময় মাত্র এক মাস, অথচ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরব আলোচনা থাকলেও গণভোটের প্রচারণা এখনো তেমন জোরালো বা দৃশ্যমান হয়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কারের পক্ষে কথা বললেও গণভোটকে কেন্দ্র করে তাদের বড় ধরনের সক্রিয়তা পরিলক্ষিত হচ্ছে না, যা জনমত তৈরিতে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
প্রেক্ষাপট ও সংস্কারের গুরুত্ব:
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে শপথ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। দীর্ঘ আলোচনার পর গত অক্টোবরে প্রণীত হয় ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব সম্বলিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। এই সনদের অন্তর্ভুক্ত সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করেই এবারের গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এই ৪৮টি প্রস্তাবকে চারটি মূল ভাগে বিভক্ত করে গণভোটের প্রশ্ন তৈরি করা হয়েছে। তবে প্রশ্নগুলো ‘জটিল ও সাধারণ মানুষের জন্য দুর্বোধ্য’ বলে অনেকেই মন্তব্য করেছেন। অধিকাংশ ভোটারের কাছে এই ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাবের বিস্তারিত ধারণা না থাকায় ব্যাপক প্রচারণার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে।
প্রচারণায় দুর্বলতা ও সরকারি উদ্যোগ:
গণভোট-সংক্রান্ত প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজ স্বীকার করেছেন, গণভোটের প্রচারে এখনো দুর্বলতা আছে, তবে তিনি আশাবাদী যে ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে এই পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। সরকার অবশ্য নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে গণভোটের বার্তা পৌঁছে দিতে মসজিদের ইমাম এবং সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের কাজে লাগানো হচ্ছে। এসব কর্মকর্তা এবং সরকার সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের এভাবে একটি নির্দিষ্ট পক্ষে প্রচার চালানো নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। তবে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, বিদ্যমান সংবিধান, গণভোট অধ্যাদেশ এবং আরপিও অনুযায়ী ইতিবাচক প্রচারমূলক কার্যক্রমে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো আইনি বাধা নেই, কারণ এই সরকারের অন্যতম ম্যান্ডেট হলো সংস্কার।
সরকারের বহুমুখী পদক্ষেপ:
অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মাঠপর্যায়ে প্রচারণা চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, তথ্য মন্ত্রণালয় ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এই কার্যক্রমে সমন্বয় করছে। গত ২২ ডিসেম্বর থেকে সারা দেশে গণভোট ও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে ‘ভোটের গাড়ি সুপারক্যারাভান’ নামে ১০টি বিশেষ వాహন যাত্রা শুরু করেছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সমস্ত সরকারি যোগাযোগপত্রে গণভোটের লোগো ব্যবহার এবং সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে ব্যানার টানানোর নির্দেশ দিয়েছে। ব্যানার, বিলবোর্ড, লিফলেট ও ফেস্টুন বিতরণের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার জন্য আলাদা দল গঠন করা হয়েছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ৬৪টি জেলায় ইমাম সমিতিগুলোকে যুক্ত করা হয়েছে, যারা সম্ভব হলে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাবেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও গ্রাম পুলিশদের (চৌকিদার) তৃণমূল পর্যায়ে প্রচারপত্র বিলি ও উঠান বৈঠকে যুক্ত করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পেজ থেকেও ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চলছে। উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গণভোটে অংশগ্রহণের এবং ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। নির্বাচন কমিশনও ব্যানার-ফেস্টুন বিতরণের মাধ্যমে গণভোটের প্রচারে অংশ নিয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২২টি এলইডি স্ক্রিনে গত ৫ জানুয়ারি থেকে গণভোট–সম্পর্কিত ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান:
গণভোটের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কথা বলছেন। অন্যদিকে, বিএনপির কিছু নেতাকর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। তবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই প্রচারণাকে দলের অবস্থান বলতে অস্বীকার করে বলেছেন, “সংস্কার আমাদের মজ্জাগত… সেখানে ‘না’ বলার কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না।” তবে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে কিছু সংস্কারের বিষয়ে বিএনপির ভিন্নমত ছিল, যা শেষ পর্যন্ত সব দলকে গণভোটের পক্ষে কতটা সরব করবে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি করেছে।
মাঠের চিত্র ও জনধারণা:
মাঠপর্যায়ে গণভোটের প্রচারণার প্রভাব এখনো সীমিত। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায়, যেমন বহদ্দারহাট থেকে টাইগারপাস বা কোতোয়ালি থেকে চকবাজার পর্যন্ত, কোনো বিলবোর্ড বা পোস্টার চোখে পড়েনি। জেলা তথ্য অফিস লিফলেট বিতরণ করলেও তা সাধারণ মানুষের মধ্যে খুব বেশি আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারেনি। ৭ জানুয়ারি চট্টগ্রামের সিআরবি মোড়ে ‘সুপার ক্যারাভান’ দেখা গেলেও, তা প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তাসহ সাধারণ মানুষের কাছে কেবল ‘ভিডিও দেখানোর গাড়ি’ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, গণভোটের গভীর বার্তা তাদের কাছে স্পষ্ট হয়নি।
ফেনী শহরের ট্রাংক রোড জিরো পয়েন্টে বিলবোর্ড, ফেস্টুন, মাইকিং ও প্রচারপত্র বিতরণ দেখা গেছে। তবে গত বৃহস্পতিবার সুপার ক্যারাভান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে এলেও ভোটার ও পথচারীদের মধ্যে তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। মহিপাল এলাকার গৃহিণী ফারহানা কলি জানান, তিনি গণভোটের কথা শুনেছেন, কিন্তু কীভাবে ভোট দিতে হবে বা এর প্রচারণা সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন। রাজধানী ঢাকাতেও গণভোটের খুব বেশি প্রচার চোখে পড়ছে না।
গণভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে গণভোটের বিষয়টিকে জনসমক্ষে আনতে এবং জনমত তৈরিতে আরও সক্রিয় হতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। এই অল্প সময়ের মধ্যে সাধারণ মানুষকে জটিল সংস্কার প্রস্তাবগুলো সম্পর্কে সচেতন করা এবং তাদের ভোটদানে আগ্রহী করে তোলা এক কঠিন চ্যালেঞ্জ।
Analysis | Habibur Rahman
