.
আন্তর্জাতিক

খাসোগি হত্যায় কি সৌদি যুবরাজকে ফাঁদ পেতেছিলেন আমিরাত প্রধান? এপস্টেইনের গোপন নথিতে বিস্ফোরক তথ্য

Email :14

১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ৬:৩৬ সোমবার বসন্তকাল

জামাল খাসোগি হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে যখন তোলপাড় চলছিল, তখন পর্দার আড়ালে এক ভিন্ন সমীকরণের সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন কুখ্যাত মার্কিন যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত এপস্টেইন-সংক্রান্ত বিপুল নথিপত্রে উঠে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির এক চাঞ্চল্যকর অধ্যায়। এপস্টেইনের ব্যক্তিগত কথোপকথন ও ইমেইল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তিনি সন্দেহ করেছিলেন—সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যার ঘটনাটি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে (এমবিএস) বিপাকে ফেলার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ানের (এমবিজেড) একটি পরিকল্পিত চাল হতে পারে।

ইমেইলে উঠে আসা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব
গত শুক্রবার প্রকাশিত প্রায় ৩০ লাখ পৃষ্ঠার নথিতে দেখা যায়, ২০১৮ সালের অক্টোবরে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে খাসোগি হত্যার ঠিক কয়েক দিন পরেই এপস্টেইন এবং আনাস আল রশিদ নামের এক ব্যক্তির মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান হয়।

১২ অক্টোবর, ২০১৮ তারিখের একটি ইমেইলে আল রশিদ খাসোগি হত্যার ঘটনাটিকে ‘বীভৎস’ বলে অভিহিত করেন। এর প্রত্যুত্তরে এপস্টেইন লেখেন, “আমার মনে হচ্ছে এর গভীরে বড় কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে। যদি শেষ পর্যন্ত দেখা যায় যে এমবিজেড (আমিরাত প্রধান) তাকে (সৌদি যুবরাজকে) ফাঁসিয়ে দিয়েছেন, তবে আমি এতে বিন্দুমাত্র বিস্মিত হব না।”

এপস্টেইনের এই মন্তব্যের জবাবে আল রশিদও সহমত পোষণ করে জানান, খাসোগি হত্যায় যুবরাজের সংশ্লিষ্টতার খবরগুলো যেভাবে এবং যতটা দ্রুততার সঙ্গে ফাঁস করা হয়েছে, তা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। তিনি একে একটি ‘গণমাধ্যম যুদ্ধ’ বা ‘মিডিয়া ওয়ার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

হ্যাক হওয়া ভিডিও ফুটেজ এবং তৃতীয় পক্ষ
প্রকাশিত নথিতে আরও একটি রোমহর্ষক তথ্য উঠে এসেছে। এপস্টেইন তার এক ‘পরোক্ষ সূত্রের’ বরাত দিয়ে জানান, খাসোগি হত্যা মিশনে অংশ নেওয়া ঘাতক দলের কোনো এক সদস্য নিজের মোবাইল ফোনে হত্যাকাণ্ডের ভিডিও রেকর্ড করেছিলেন। পরবর্তীতে সেই ফোনটি হ্যাক করা হয় এবং তৃতীয় কোনো পক্ষ সেই ফুটেজটি হাতিয়ে নেয়। তবে কারা এই হ্যাকিংয়ের সঙ্গে জড়িত ছিল, সে বিষয়ে ইমেইলে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি।

এই কথোপকথনের সময় আল রশিদ সতর্ক করে বলেছিলেন, সৌদি আরব যদি দ্রুত নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার না করে এবং সত্য প্রকাশ না করে, তবে তারা তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন হারাতে পারে।

খাসোগিকে ‘সন্ত্রাসী’ প্রমাণের চেষ্টা?
হত্যাকাণ্ডের পর এপস্টেইন বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেছিলেন। ১৩ অক্টোবরের একটি বার্তায় তিনি জানতে চান, জামাল খাসোগিকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব কি না। এমনকি পুরো ঘটনাটিকে একটি ‘ব্যর্থ গোপন অভিযান’ বা সৌদি যুবরাজের জন্য পাতা কোনো ‘ফাঁদ’ হিসেবে উপস্থাপন করা যায় কি না—সে বিষয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।

তাৎপর্যপূর্ণভাবে, এসব কথোপকথনে বারবার আমিরাতের শাসক মোহাম্মদ বিন জায়েদের নাম উঠে আসে। এমনকি ওই দিন রাতেই এপস্টেইন একটি বার্তা পান (প্রেরকের নাম নথিতে গোপন রাখা হয়েছে), যেখানে বলা হয়— মোহাম্মদ বিন জায়েদ একটি ‘জরুরি’ বৈঠকের অনুরোধ করেছেন এবং পরদিন সকালেই সেই বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

নেপথ্যের সমীকরণ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
জামাল খাসোগি ২০১৮ সালের ২ অক্টোবর তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশের পর নিখোঁজ হন এবং পরে জানা যায় তাকে সেখানে হত্যা করা হয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তদন্তে উঠে আসে যে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এই অভিযানের অনুমোদন দিয়েছিলেন। তবে এপস্টেইনের এই কথোপকথন ঘটনাটিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, তৎকালীন সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের দুই প্রভাবশালী নেতার মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বা ষড়যন্ত্রের কোনো গোপন সমীকরণ এপস্টেইনের মতো প্রভাবশালীদের নজরে ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ট্রান্সপারেন্সি আইনের আওতায় প্রকাশিত এসব নথিতে কেবল খাসোগি প্রসঙ্গই নয়; ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিল গেটস, ইলন মাস্ক এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মতো বিশ্বনেতা ও ধনকুবেরদের নামও উঠে এসেছে, যা নিয়ে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts