১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ১:৪৭ বৃহস্পতিবার শীতকাল
সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে ক্যাটারিংয়ের খাবার খেয়ে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা জনমনে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। আনন্দঘন মুহূর্তগুলো সামান্য অসাবধানতায় কীভাবে বিষাদে রূপ নিতে পারে, এই ঘটনাটি তারই এক বড় সতর্কবার্তা। চিকিৎসকরা বলছেন, ‘ফুড পয়জনিং’ বা খাবারে বিষক্রিয়া কেবল পেটের পীড়া নয়, বরং প্রাণঘাতীও হতে পারে। বিশেষ করে উৎসবের মৌসুমে বাইরের খাবার বা ঘরে আনা খাবারের ক্ষেত্রে সচেতনতা না বাড়ালে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের বিপদ। এ বিষয়ে বিস্তারিত পরামর্শ দিয়েছেন ডা. কাকলী হালদার।

‘সাইলেন্ট কিলার’ হতে পারে উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাবার
সব ধরনের খাবার নষ্ট হওয়ার সময়সীমা এক নয়। ডা. কাকলী হালদার জানান, উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার যেমন—মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাতীয় খাবারগুলোতে ব্যাকটেরিয়া খুব দ্রুত বংশবিস্তার করে। ফলে এগুলো অল্প সময়েই খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এছাড়া রান্না করা ডাল বা শাকসবজি গরম আবহাওয়ায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, বিয়ে বা অনুষ্ঠানের ক্যাটারিংয়ের খাবারে সাধারণত প্রচুর তেল ও মসলা ব্যবহার করা হয়। এই মসলার তীব্র ঘ্রাণ ও স্বাদের আড়ালে খাবার যে নষ্ট হয়ে গেছে বা তাতে পচন ধরেছে, তা খালি চোখে বা সাধারণ জিহ্বায় বোঝা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। আর এই না বোঝাটাই ডেকে আনে ভয়াবহ বিপদ।
খাবার সংরক্ষণ: ২ ঘণ্টার নিয়ম
রান্না করা খাবার কতক্ষণ বাইরে রাখা নিরাপদ? এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা ‘টু আওয়ার রুল’ বা দুই ঘণ্টার নিয়মের কথা বলেন। রান্না করা খাবার ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় দুই ঘণ্টার বেশি ফেলে রাখা উচিত নয়। খাবার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ফ্রিজ ব্যবহারের সঠিক নিয়ম মানাও জরুরি।
- অবশ্যই ঢাকনাযুক্ত বা বায়ুরোধী (এয়ারটাইট) পাত্রে খাবার সংরক্ষণ করতে হবে।
- ফ্রিজের ভেতরে কাঁচা মাছ-মাংস এবং রান্না করা খাবার কখনোই পাশাপাশি রাখা যাবে না। কাঁচা খাবারের জীবাণু যেন রান্না করা খাবারে ছড়িয়ে না পড়ে (ক্রস কন্টামিনেশন), সে জন্য ভিন্ন ভিন্ন তাকে বা বক্সে খাবার আলাদা করে রাখতে হবে।
বাসি খাবার ও মাইক্রোওয়েভ ব্যবহারে সতর্কতা
অনেকেই বেঁচে যাওয়া খাবার ফ্রিজে রেখে পরের দিন গরম করে খান। তবে ডা. কাকলী হালদার সতর্ক করে বলেন, খাবার বারবার গরম করা উচিত নয়। এতে খাবারের পুষ্টিগুণ তো নষ্ট হয়ই, উল্টো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর সুযোগ পায়।
ফ্রিজ থেকে বের করা খাবার সরাসরি চুলার বা ওভেনের অতিরিক্ত তাপে দেওয়া ঠিক নয়। প্রথমে খাবারটি কিছুক্ষণ সাধারণ তাপমাত্রায় রেখে স্বাভাবিক হতে দিন। এরপর এমনভাবে গরম করতে হবে যেন তা থেকে ধোঁয়া ওঠে। মাইক্রোওয়েভ ওভেনে খাবার গরম করার ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ নিয়ম মানা জরুরি:
১. সব সময় ওভেনপ্রুফ পাত্র ব্যবহার করতে হবে এবং ঢাকনা দিয়ে গরম করতে হবে।
২. একবারে গাদা করে অনেক খাবার না দিয়ে, পাত্রে একটি স্তরে (সিঙ্গেল লেয়ার) খাবার ছড়িয়ে দিলে তাপ সমানভাবে লাগে।
৩. অতিরিক্ত তাপে তাড়াহুড়ো না করে, মাঝারি তাপে সময় নিয়ে গরম করা নিরাপদ।
৪. খাবারটি সুষমভাবে গরম হলো কি না তা নিশ্চিত করতে মাঝে একবার চামচ দিয়ে নেড়ে দেওয়া ভালো।
৫. খাবারটি যেন অন্তত ১৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
বাইরের খাবার ও শিশুদের সুরক্ষা
হোটেল, রেস্তোরাঁ বা যেকোনো অনুষ্ঠানের খাবার খাওয়ার আগে পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া সবার আগে জরুরি। খাবার মুখে দেওয়ার পর যদি স্বাদ অন্যরকম লাগে, টক গন্ধ পাওয়া যায় কিংবা খাবারটি আঠালো (স্টিকি) মনে হয়, তবে বিন্দুমাত্র ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। মায়া করে সেই খাবার খেলে বিপদ হতে পারে।
বিশেষ করে শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বা ইমিউনিটি বড়দের তুলনায় অনেক কম। তাই পচা বা বাসি খাবারের বিষক্রিয়া তাদের শরীরে দ্রুত ও মারাত্মক প্রভাব ফেলে। তাই শিশুদের বাইরের খাবার দেওয়ার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সচেতনতাই পারে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ও স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে। তাই রসনা বিলাসের আগে খাবারের মান যাচাই করা এখন সময়ের দাবি।
Analysis | Habibur Rahman