.
কুমারখালী

কুষ্টিয়ায় শ্রমিক দল নেতা নিখোঁজ: চাঁদাবাজিকে ঘিরে দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড?

Email :73

১৫ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১০ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ৮:২১ শনিবার বসন্তকাল

পদ্মার বুকে কেবল পলিমাটি ভাসে না, ভাসে ক্ষমতার দম্ভ, টাকার লোভ আর অমীমাংসিত রহস্য। রোববার দুপুরে কুষ্টিয়া জেলা শ্রমিক দলের নেতা আবেদুর রহমান আন্নুর হারিয়ে যাওয়া সেই রহস্যেরই এক নতুন, রক্তাক্ত অধ্যায়। তার নিথর দেহের খোঁজে যখন ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল নদীর গভীরে তল্লাশি চালাচ্ছে, তখন জনমনে ভাসছে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন গল্প। একটি নিছক দুর্ঘটনার, দ্বিতীয়টি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের, আর তৃতীয়টি বালুমহালের অন্ধকার জগতের এক নৃশংস সংঘাতের। এই তিন গল্পের মাঝেই লুকিয়ে আছে আন্নুর অন্তর্ধানের আসল সত্য।


সরকারি ভাষ্য এবং প্রাথমিক তথ্যের ছবিটা বেশ সরল। জেলা শ্রমিক দলের যুগ্ম সম্পাদক আন্নু একটি ছোট নৌকায় করে বালুবাহী ট্রলার থেকে “টাকা তুলছিলেন”। এমন সময় একটি বড় ট্রলারের ধাক্কায় নৌকাটি ডুবে যায়। নৌকার বাকিরা প্রাণে বাঁচলেও, আন্নু স্রোতের টানে হারিয়ে যান। ফায়ার সার্ভিস ও নৌ-পুলিশের ভাষ্যেও এই “চাঁদা তুলতে গিয়ে দুর্ঘটনা”র কথাই উঠে এসেছে। এই গল্প অনুযায়ী, আন্নু কেবলই এক অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার শিকার।

দ্বিতীয় অধ্যায়: পরিবারের আর্তনাদ ও ষড়যন্ত্রের গন্ধ
কিন্তু আন্নুর পরিবার এই সরল গল্প মানতে নারাজ। তাদের কাছে এটি দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি নিখুঁত ষড়যন্ত্র। আন্নুর ভগ্নিপতি কবির হোসেন টুটুলের অভিযোগের আঙুল সরাসরি বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রকদের দিকে। তার দাবি, “বালুঘাটের ইজারার দ্বন্দ্ব”-ই আন্নুর জীবনের কাল হয়েছে। তাকে পরিকল্পিতভাবে নদীতে ফেলে হত্যা করা হয়েছে। পরিবারের এই বক্তব্যে দুর্ঘটনার গল্পটি মুহূর্তেই একটি সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ডের চিত্রনাট্যে পরিণত হয়, যেখানে চাঁদা তোলাটা ছিল কেবলই একটি অজুহাত, আসল উদ্দেশ্য ছিল পথের কাঁটা সরিয়ে দেওয়া।


সবচেয়ে ভয়ঙ্কর গল্পটি শোনা যাচ্ছে পদ্মাপাড়ের বাতাসে, বালুমহালের অন্ধকার জগত থেকে। সেই গল্পে বলা হচ্ছে, এটি দুর্ঘটনা বা একতরফা হত্যাকাণ্ড নয়, এটি ছিল টাকার ভাগাভাগি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এক রক্তাক্ত সংঘাত। পাবনা-কুষ্টিয়া সীমান্তের অবৈধ বালু উত্তোলনকে ঘিরে যে কোটি কোটি টাকার খেলা চলে, আন্নু ছিলেন তার অন্যতম নিয়ন্ত্রক। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে একটি সূত্র জানাচ্ছে, টাকার বনিবনা না হওয়ায় আন্নুর সাথে অন্য একটি গ্রুপের ধস্তাধস্তি হয় এবং এক পর্যায়ে তাকে মারধর করে বাল্কহেড থেকে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। এই গল্পটি প্রমাণ করে, পদ্মার বুকে আইন নয়, পেশিশক্তিই শেষ কথা।


এই তিন গল্পের চেয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) একটি মন্তব্য। যখন পুরো এলাকা একজন রাজনৈতিক নেতার অন্তর্ধান নিয়ে তোলপাড়, তখন তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, “এমন কোনো খবর আমার জানা নেই”। একটি থানার অধিনস্ত এলাকায় এত বড় একটি ঘটনা ঘটার পরেও ওসির এই “অজ্ঞতা” কি নিছকই প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাকি ক্ষমতাশালী বালু সিন্ডিকেটকে আড়াল করার এক নীরব সম্মতি?

শেষ পর্যন্ত, ডুবুরি দল হয়তো আন্নুর দেহ খুঁজে পাবে, কিন্তু যে সত্যটি পদ্মার গভীরে তলিয়ে গেছে, তা কি কখনও উপরে ভেসে উঠবে? আন্নুর অন্তর্ধান আবারও প্রমাণ করলো, পদ্মার বুকে বালুর চেয়েও সহজলভ্য হয়তো মানুষের জীবন, আর তার চেয়েও দামি ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts