১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ১২:০০ বৃহস্পতিবার শীতকাল
লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে এক শ্বাসরুদ্ধকর সামরিক অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের এই আচমকা হামলায় দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনীতিতে এক বড় কম্পন সৃষ্টি করেছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, কারাকাসের এই পতন বা মাদুরোকে অপহরণ—কোনোটিই আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি গত ২৬ বছর ধরে ওয়াশিংটন ও কারাকাসের মধ্যে চলতে থাকা বৈরিতা, অবরোধ এবং স্নায়ুযুদ্ধের এক চূড়ান্ত পরিণতি।
২০২৬: চূড়ান্ত আঘাত ও মাদুরোর পতন
কারাকাসের আকাশে তখন ভোরের আলো ফোটেনি, তখনই বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে প্রেসিডেন্টের বাসভবন এলাকা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে এই অভিযান পরিচালিত হয় বলে জানা গেছে। এর আগে ২০২৫ সালেই ট্রাম্প প্রশাসন ক্যারিবীয় সাগরে নজিরবিহীনভাবে সেনা ও রণতরী মোতায়েন করে ভেনেজুয়েলার ওপর চূড়ান্ত চাপ সৃষ্টি করেছিল। সেই অবরোধের এক বছর পূর্ণ না হতেই সরাসরি রাজধানীর বুকে হানা দিয়ে মাদুরো দম্পতিকে তুলে নিয়ে গেল মার্কিন বাহিনী।
১৯৯৯: সংঘাতের শুরু যেখানে
যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সম্পর্কের এই ফাটল শুরু হয়েছিল গত শতাব্দীর শেষ প্রান্তে। ১৯৯৯ সালে হুগো চাভেজ যখন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তখন তিনি কেবল সরকার পরিবর্তন করেননি, বদলে দিয়েছিলেন দেশটির মূল নীতি। চাভেজ ‘বলিভিয়ান বিপ্লব’-এর ডাক দেন, যা ছিল মূলত ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক সিমন বলিভারের আদর্শে উজ্জীবিত। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান নিয়ে তিনি সংবিধান সংস্কার করেন এবং সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি দেন তেল খাত জাতীয়করণের মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে আঘাত লাগায় তখন থেকেই ওয়াশিংটনের ‘চোখের বালি’তে পরিণত হয় কারাকাস।
অবিশ্বাসের বীজ ও অভ্যুত্থান চেষ্টা
দুই দেশের সম্পর্কে অবিশ্বাসের দেয়াল স্থায়ীভাবে গেঁথে যায় ২০০২ সালে। সে সময় একটি সামরিক অভ্যুত্থানে হুগো চাভেজকে ৪৮ ঘণ্টার জন্য ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। চাভেজ সরকার ও তাঁর সমর্থকরা দৃঢ়ভাবে দাবি করেন, এই কলকাঠি নেড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। যদিও ওয়াশিংটন তা অস্বীকার করে, কিন্তু এরপর চাভেজ পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের বলয় থেকে বেরিয়ে আসেন। ২০০০ সালের পর থেকেই তিনি রাশিয়া, চীন ও ইরানের মতো মার্কিন-বিরোধী শক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব গভীর করেন এবং কারাকাস থেকে মার্কিন কূটনীতিক ও এনজিওদের বহিষ্কার শুরু করেন।
মাদুরো আমল ও অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ
২০১৩ সালে হুগো চাভেজের মৃত্যুর পর ক্ষমতার ব্যাটন হাতে নেন নিকোলা মাদুরো। তিনি চাভেজের নীতি আঁকড়ে ধরলেও দেশটির অর্থনীতিতে ধস নামতে শুরু করে। এই সুযোগটিই কাজে লাগায় যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ভেনেজুয়েলার ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা জারি করে ওবামা প্রশাসন।
পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয় ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা কঠোর করা হয় এবং আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে দেশটির প্রবেশ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে দেশটিতে আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।
গণতন্ত্রের প্রশ্ন ও ক্ষমতার লড়াই
২০১৮ সালে মাদুরোর পুনর্নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হলে বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদো নিজেকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে গুয়াইদোকে সমর্থন দেয়, যা মাদুরো সরকারের ওপর চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালেও পরিস্থিতি বদলায়নি। নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থী এদমুন্দো গোনসালেসকে হারিয়ে মাদুরো জয়ী হলেও জাতিসংঘসহ পশ্চিমা বিশ্ব সেই ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে।
শেষের শুরু
২০২৪-এর বিতর্কিত নির্বাচনের পর ২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে ভেনেজুয়েলার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। ক্যারিবীয় সাগরে মার্কিন রণতরীর উপস্থিতি এবং কারাকাসের ওপর নতুন করে কঠোরতম চাপ শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের এই সামরিক আগ্রাসনে রূপ নিল।
মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ভেনেজুয়েলায় সমাজতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটবে, নাকি দেশটি দীর্ঘমেয়াদী গৃহযুদ্ধের কবলে পড়বে—তা সময়ই বলে দেবে। তবে আড়াই দশকের এই আগ্রাসন ও প্রতিরোধের ইতিহাসে কারাকাসের এই ঘটনা যে লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে এক নতুন ও অনিশ্চিত অধ্যায়ের সূচনা করল, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
Analysis | Habibur Rahman
