১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৩:২৯ সোমবার বসন্তকাল
ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত এক বিশাল মহাসমাবেশ থেকে আহমদিয়া (কাদিয়ানি) সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সম্মিলিত খতমে নবুওয়ত পরিষদ আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ৬-দফা দাবি উত্থাপনের পাশাপাশি দাবি আদায় না হলে দেশব্যাপী কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশের আলেমদের উপস্থিতিতে আহমদিয়াদের ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান স্পষ্ট হওয়ায় বিষয়টি জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
৬-দফায় ধর্মীয় ও সামাজিক বিধিনিষেধের দাবি
সম্মেলনে খতমে নবুয়ত পরিষদের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত ৬-দফা ঘোষণাপত্রে আহমদিয়াদের সাংবিধানিক পরিচয়ের পাশাপাশি তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপের দাবি তোলা হয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- সাংবিধানিক পরিচয়: আহমদিয়া সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে সংখ্যালঘু অমুসলিম হিসেবে ঘোষণা করা।
- ধর্মীয় পরিভাষা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা: তাদের ইসলাম, কালেমা, নামাজ, রোজা, ঈদ, কোরবানি ইত্যাদি ইসলামী পরিভাষা ও আচার-অনুষ্ঠান পালনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা।
- উপাসনালয়: তাদের উপাসনালয়কে ‘মসজিদ’ বলা এবং মিনার বা গম্বুজের মতো ইসলামী স্থাপত্যশৈলী ব্যবহার নিষিদ্ধ করা।
- সামাজিক সম্পর্ক: মুসলিমদের সঙ্গে আহমদিয়াদের বিবাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা।
- শেষকৃত্য ও উত্তরাধিকার: মুসলিমদের কবরস্থানে তাদের দাফন করা এবং মুসলিমদের সম্পত্তিতে তাদের উত্তরাধিকার আইনত বাতিল করা।
- প্রচারণা: ইসলামের নামে তাদের ধর্মীয় বই, পুস্তিকা বা অনুবাদ প্রকাশ ও প্রচার বন্ধ করা।
বছরব্যাপী পর্যায়ক্রমিক কর্মসূচি
দাবি আদায়ের লক্ষ্যে একটি বছরব্যাপী ধারাবাহিক ও পর্যায়ক্রমিক কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়, যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর কঠোর রূপ নেওয়ার ইঙ্গিত বহন করছে। কর্মসূচির ধাপগুলো হলো:
১. গণস্বাক্ষর (নভেম্বর ২০২৫ – এপ্রিল ২০২৬): দেশজুড়ে সর্বস্তরের মানুষের কাছ থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহ।
২. স্মারকলিপি (মে-জুন ২০২৬): প্রতিটি জেলা প্রশাসকের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে স্মারকলিপি পেশ।
৩. বিভাগীয় মহাসম্মেলন (জুলাই-নভেম্বর ২০২৬): প্রতিটি বিভাগে জনমত তৈরির লক্ষ্যে মহাসম্মেলন আয়োজন।
৪. চূড়ান্ত পদক্ষেপ (ডিসেম্বর ২০২৬): উপরের কর্মসূচিগুলোতে দাবি পূরণ না হলে দেশের শীর্ষ আলেমদের নিয়ে জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে “কঠিন থেকে কঠিনতর কর্মসূচি” ঘোষণা করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফ্ফুজে খতমে নবুওয়ত বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানী।
রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন ও প্রতিশ্রুতি
এই সম্মেলনকে ঘিরে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর একাংশের মধ্যে এক ধরনের ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন ইসলামপন্থী দলের নেতারা মঞ্চে উপস্থিত থেকে দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
- বিএনপি: দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ক্ষমতায় গেলে তারা সংবিধানে আল্লাহর ওপর আস্থা পুনর্বহাল করবেন এবং আহমদিয়াদের বিষয়টি “সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান” করার প্রতিশ্রুতি দেন।
- ইসলামী আন্দোলন: দলের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম (চরমোনাই পীর) সরাসরি আহমদিয়াদের “কাফের” আখ্যা দিয়ে সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে তাদের অমুসলিম ঘোষণার দাবি জানান।
- জামায়াতে ইসলামী: দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা দেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে আহমদিয়াদের অমুসলিম ঘোষণা করবে।
নাগরিক সমাজের উদ্বেগ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আশঙ্কা
এই কর্মসূচির প্রতিক্রিয়ায় দেশের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ‘নাগরিক কোয়ালিশন’ এক বিবৃতিতে বলেছে, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটের রাজনীতিতে ফায়দা লুটতে কিছু রাজনৈতিক দল আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দিচ্ছে। এই ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে পারে। তারা ধর্মকে ব্যবহার করে ঘৃণা ও সহিংসতা সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর বিষয়ে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
প্রেক্ষাপট ও মানবাধিকার উদ্বেগ
ঘোষণাপত্রে পাকিস্তানের উদাহরণ টেনে বলা হয়, সেখানে ১৯৭৪ সালে সাংবিধানিকভাবে আহমদিয়াদের অমুসলিম ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশে সাংবিধানিকভাবে ধর্মীয় স্বাধীনতা বহাল থাকলেও অতীতে পঞ্চগড়, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন স্থানে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, খতমে নবুওয়ত পরিষদের এই সম্মেলন, ৬-দফা দাবি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতি দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
Analysis | Habibur Rahman


