১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ৪ঠা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৪ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ২:৪৯ বুধবার বসন্তকাল
মহাবিশ্বে মানুষ কি আসলেই একা? নাকি সুদূরের কোনো নক্ষত্রের বুকে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো প্রাণ? মানবজাতির এই চিরন্তন কৌতূহল মেটাতে এবার একজোট হয়েছে ভারত ও জাপান। যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় তৈরি হতে যাচ্ছে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দূরবিক্ষণ যন্ত্র বা টেলিস্কোপ, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘থার্টি মিটার টেলিস্কোপ’ (টিএমটি)।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মূল লক্ষ্য হলো মহাকাশের গভীরতম অংশে দৃষ্টি দেওয়া এবং পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে বের করা। ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এই টেলিস্কোপটি তার কার্যক্রম শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

৩০ মিটারের অতিকায় আয়না ও ভারতীয় প্রযুক্তি
টিএমটি-এর প্রধান বিশেষত্ব হলো এর ৩০ মিটার দীর্ঘ বিশাল আয়না। তবে এটি একটি অখণ্ড কাচ নয়, বরং ৫০০টি ছোট ছোট আয়নার সমন্বয়ে গঠিত হবে এই অতিকায় লেন্সটি। জাপানের জাতীয় মহাকাশনীতি কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান সাকু সুনেতা জানান, এতগুলো ছোট আয়নাকে নিখুঁত কোণ ও অবস্থানে বসিয়ে একটি বড় আয়নার রূপ দেওয়া অত্যন্ত জটিল কাজ। আর এই আয়নাগুলোকে ঠিকঠাক বসানোর অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে ভারত।
ভারতের পক্ষে বেঙ্গালুরুর আইআইএ, পুনের আইইউসিএএ এবং নৈনিতালের এআরআইইএস—এই তিন প্রতিষ্ঠান প্রকল্পে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। ২০১৪ সালেই ভারত সরকার এই প্রকল্পে অংশগ্রহণের অনুমোদন দেয়।
কী খুঁজবে এই টেলিস্কোপ?
মহাবিশ্বের কৃষ্ণগহ্বর (ব্ল্যাকহোল), দূরবর্তী ছায়াপথ এবং মহাবিশ্বের উৎপত্তিকালীন অবস্থা নিয়ে গবেষণা করবে টিএমটি। তবে এর সবচেয়ে রোমাঞ্চকর মিশন হলো ‘এক্সোপ্ল্যানেট’ বা সৌরজগতের বাইরের গ্রহগুলোতে প্রাণের সন্ধান।
ড. সুনেতা বলেন, ‘জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, পৃথিবী ছাড়াও অন্য কোথাও প্রাণ আছে। এই টেলিস্কোপটি দূরের গ্রহগুলোতে জলীয়বাষ্প বা প্রাণের অস্তিত্বের ইঙ্গিতবাহী রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণ করবে।’ প্রচলিত টেলিস্কোপের চেয়ে এর আয়না অনেক বড় হওয়ায় এটি অনেক দূরের ও অস্পষ্ট বস্তুর স্বচ্ছ ছবি তুলতে সক্ষম হবে।
কোথায় বসবে এই বিশাল চোখ?
টিএমটি স্থাপনের জন্য প্রাথমিকভাবে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের ‘মাউনা কেয়া’ পাহাড়কে বেছে নেওয়া হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪ হাজার মিটার (১৩ হাজার ফুট) উঁচুতে অবস্থিত এই স্থানটি আকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য বিশ্বের সেরা জায়গাগুলোর একটি।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে মাউনা কেয়া একটি পবিত্র স্থান হওয়ায় সেখানে নির্মাণকাজ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। প্রতিবাদ ও সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার বিষয়টি মাথায় রেখে আলোচনার পাশাপাশি বিকল্প স্থানের কথাও ভাবা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ভারতের লাদাখের ‘হানলে’ এলাকাটি বিবেচনায় রয়েছে, যেখানে ইতিমধ্যেই একটি মানমন্দির রয়েছে।
ভবিষ্যতের নোবেল ও তরুণ বিজ্ঞানী
এই টেলিস্কোপ যদি সত্যিই ভিনগ্রহের প্রাণের সন্ধান দিতে পারে, তবে তা হবে বিজ্ঞানের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা আবিষ্কার। এ বিষয়ে ড. সুনেতা বলেন, ‘আমি বৃদ্ধ হয়েছি, তাই নোবেল আমার জন্য নয়। এই আবিষ্কারের মাধ্যমে পুরস্কার পেলে তা তরুণ বিজ্ঞানীদেরই পাওয়া উচিত। তবে সাফল্য এলে পুরো দলই সম্মানিত হবে।’
উল্লেখ্য, জাপান ও ভারত লুপেক্স মিশনের মাধ্যমে চাঁদে পানির সন্ধান করছে। এবার টিএমটি প্রকল্পের মাধ্যমে নক্ষত্রের পানে চেয়ে তারা খুঁজবে মহাজাগতিক নিঃসঙ্গতার উত্তর।
Analysis | Habibur Rahman
