১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ১২:১৩ সোমবার বসন্তকাল
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে ২০২৫ সালটি চিহ্নিত হয়েছে এক বড় ধরনের পালাবদলের বছর হিসেবে। প্রযুক্তির উৎকর্ষ, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অভাবনীয় উত্থান কর্মসংস্থানের চিত্রে বড়সড় ধস নামিয়েছে। করোনা মহামারির পর শ্রমবাজারে এমন অস্থিরতা আর দেখা যায়নি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কেবল এই এক বছরেই চাকরি হারিয়েছেন ১১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি কর্মী, যার নেপথ্যে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে এআই-এর ব্যবহার।

পরিসংখ্যান কী বলছে?
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘চ্যালেঞ্জার, গ্রে অ্যান্ড ক্রিসমাস’-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এখন পর্যন্ত ঘোষিত ছাঁটাইয়ের মোট সংখ্যা ১১ লাখ ৭০ হাজার ছাড়িয়েছে। এর আগে ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময়ে ২২ লাখের বেশি কর্মী চাকরি হারিয়েছিলেন। অর্থাৎ, গত পাঁচ বছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ ছাঁটাইয়ের রেকর্ড।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিপুল ছাঁটাইয়ের মধ্যে অন্তত ৫৫ হাজার কর্মীর চাকরি যাওয়ার পেছনে সরাসরি দায়ী করা হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, শুল্ক জটিলতা এবং পরিচালন ব্যয় কমিয়ে মুনাফা বাড়ানোর চাপে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এখন মানুষের বদলে প্রযুক্তির ওপরই বেশি ভরসা রাখছে।
প্রযুক্তি জায়ান্টদের ছাঁটাইয়ের খতিয়ান
বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্যবসায়িক কৌশল পরিবর্তন করতে গিয়ে ব্যাপক হারে কর্মী ছাঁটাই করেছে। তাদের মূল লক্ষ্য এখন এআই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো।
- অ্যামাজন: ই-কমার্স জায়ান্ট অ্যামাজন তাদের ইতিহাসের অন্যতম বড় ছাঁটাই কার্যক্রম চালিয়েছে এ বছর। অক্টোবরে প্রতিষ্ঠানটি ঘোষণা দেয় যে, তারা ১৪ হাজার করপোরেট কর্মীকে ছাঁটাই করছে। অ্যামাজনের শীর্ষ কর্মকর্তা বেথ গ্যালেটি এই সিদ্ধান্তকে প্রতিষ্ঠানকে আরও ‘লিন’ বা মেদহীন করার প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রধান নির্বাহী অ্যান্ডি জ্যাসির মতে, ইন্টারনেটের পর এআই হলো সবচেয়ে বড় রূপান্তরকারী প্রযুক্তি, যা অনেক ক্ষেত্রে মানুষের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিয়েছে।
- মাইক্রোসফট: প্রযুক্তি খাতের আরেক বিশাল নাম মাইক্রোসফট ২০২৫ সালে ধাপে ধাপে প্রায় ১৫ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। এর মধ্যে জুলাই মাসেই বাদ দেওয়া হয় ৯ হাজার কর্মীকে। প্রতিষ্ঠানটির সিইও সত্য নাদেলা স্পষ্ট করেছেন যে, তাঁরা এখন আর সাধারণ সফটওয়্যার কোম্পানি নন, বরং একটি ‘ইন্টেলিজেন্স ইঞ্জিন’-এ রূপান্তরিত হতে চান। আর এই নতুন কাঠামোর সঙ্গে খাপ খাওয়াতেই কর্মী কমাতে হয়েছে।
- সেলসফোর্স: কাস্টমার সাপোর্ট বা গ্রাহক সেবা খাতে এআই-এর প্রভাব কতটা তীব্র, তা বোঝা যায় সেলসফোর্সের পদক্ষেপে। প্রতিষ্ঠানটির সিইও মার্ক বেনিওফ জানিয়েছেন, তাঁদের কোম্পানির প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ এখন এআই করছে। ফলে গ্রাহক সেবায় নিয়োজিত কর্মীর সংখ্যা ৯ হাজার থেকে কমিয়ে ৫ হাজারে নামিয়ে আনা হয়েছে, যার ফলে চাকরি হারিয়েছেন ৪ হাজার মানুষ।
- আইবিএম: আইবিএম-এর সিইও অরবিন্দ কৃষ্ণ জানিয়েছেন, মানবসম্পদ (এইচআর) বিভাগের অনেক কাজ এখন এআই চ্যাটবট দিয়েই করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে শত শত এইচআর কর্মীর আর প্রয়োজন হচ্ছে না। নভেম্বরে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বব্যাপী তাদের মোট জনবলের ১ শতাংশ বা প্রায় ৩ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেয়। তবে আশার কথা হলো, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং ও বিপণন খাতে তারা নতুন নিয়োগ অব্যাহত রেখেছে।
- অন্যান্য প্রতিষ্ঠান: সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ‘ক্রাউডস্ট্রাইক’ এআইকে তাদের ব্যবসার ‘ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার’ হিসেবে অভিহিত করে মে মাসে ৫০০ কর্মী ছাঁটাই করে। অন্যদিকে, এইচআর সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার্কডে’ এআই খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ৭৫০ জন কর্মীকে বিদায় জানায়।
ভবিষ্যৎ কর্মবাজারের ইঙ্গিত
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালের এই চিত্রটি ভবিষ্যতের কর্মবাজারের জন্য একটি সতর্কবার্তা। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী দিনগুলোতে গতানুগতিক পেশাগুলো বিলুপ্তির পথে হাঁটবে। কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকতে হলে কর্মীদের এখন কেবল দক্ষতাই নয়, বরং এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজ করার মতো যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। যেসব কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা সম্ভব, সেখানে মানুষের স্থান সংকুচিত হতে থাকবে—এটিই এখন করপোরেট বিশ্বের নতুন বাস্তবতা।
Analysis | Habibur Rahman