.
রাজনীতি

ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে ব্যাংকাররা: ছবি প্রকাশ ও বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞাসহ একগুচ্ছ প্রস্তাব

Email :18

১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ৪ঠা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৪ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ২:৪৭ বুধবার বসন্তকাল

দেশের ব্যাংকিং খাতকে গ্রাস করা খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরতে এবার নজিরবিহীন কঠোর পদক্ষেপের পথে হাঁটতে চায় ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)। আদালতের পূর্বানুমতি ছাড়াই ঋণখেলাপিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং জনসমক্ষে তাদের নাম ও ছবি প্রকাশের মতো স্পর্শকাতর দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

গত ১২ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে এক বৈঠকের ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন স্বাক্ষরিত একটি বিস্তারিত প্রস্তাবনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে। এতে খেলাপি ঋণ আদায়, আইনি জটিলতা নিরসন এবং জামানত বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া সহজীকরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)

সামাজিকভাবে কোণঠাসা করার কৌশল
এবিবির প্রস্তাবনায় খেলাপিদের কেবল আর্থিকভাবে নয়, সামাজিকভাবেও চাপে ফেলার কৌশল নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোর দাবি, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা যেন কোনোভাবেই আদালতের নির্দেশনা ছাড়া বিদেশে পাড়ি জমাতে না পারেন। একইসঙ্গে, সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার অংশ হিসেবে ব্যাংকগুলোকে ঋণখেলাপিদের নাম ও ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশের ঢালাও অনুমতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া, ঋণখেলাপিরা যাতে কোনো ধরনের ব্যবসায়ী সংগঠন বা সমিতির নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, সে বিষয়েও নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব করেছে এবিবি।

আইনি প্যাঁচ খোলার উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদী আটকাদেশ
ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে আইনি দীর্ঘসূত্রতা একটি বড় বাধা। এটি কাটাতে এবিবি অর্থঋণ আদালত আইনের সংশোধনের দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—দেওয়ানি আটকাদেশের মেয়াদ ৬ মাস থেকে বাড়িয়ে ঋণের অংক ভেদে ৭ বছর পর্যন্ত উন্নীত করা। এছাড়া মামলার রায় কার্যকরের ক্ষেত্রে ব্যাংক বা আদালতের যেকোনো পদক্ষেপের বিপরীতে উচ্চ আদালতে রিট বা আপিল করতে হলে নির্দিষ্ট পরিমাণ ‘ডাউনপেমেন্ট’ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সিআইবি রিপোর্টের বিপরীতে উচ্চ আদালত থেকে ‘স্টে-অর্ডার’ বা স্থগিতাদেশ নেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতেও কঠোর আইনের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। তারা বলছে, স্টে-অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের শুনানি নিশ্চিত করতে হবে এবং কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের শর্ত মানা না হলে আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়াই সেই স্থগিতাদেশ বাতিল বলে গণ্য হতে হবে।

সম্পদ বিক্রি ও নিলাম প্রক্রিয়া সহজীকরণ
বন্ধকী সম্পত্তি নিলামে তোলার প্রক্রিয়াটি জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। এ সংকট কাটাতে এবিবি প্রস্তাব করেছে, নিলামে সম্পত্তি কিনলে ক্রেতাদের আয়কর রেয়াত বা প্রণোদনা দেওয়া হোক। একইসঙ্গে নিলামকৃত সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সব ধরনের আয়কর ও ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়া জেলা প্রশাসকের অনুমোদন ছাড়াই নিলামকৃত সম্পদ কেনাবেচার সুযোগ এবং বন্ধকদাতার অনুপস্থিতিতেই জমির জরিপ ও নামজারি সম্পন্ন করার অটোমেশন সুবিধা চেয়েছে ব্যাংকগুলো।

ব্যক্তিগত সম্পদের ডেটাবেজ ও ঋণ অবলোপন
ঋণ দেওয়ার আগেই গ্রাহকের সক্ষমতা যাচাইয়ে সিআইবি (CIB) ডেটাবেজের আদলে একটি ‘ব্যক্তিগত সম্পদের ডেটাবেজ’ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে এবিবি। এর মাধ্যমে সহজেই গ্রাহকের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ যাচাই করা সম্ভব হবে। এছাড়া খেলাপি ঋণ কমাতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে আংশিক ঋণ অবলোপন (Write-off) সুবিধা এবং লিয়েন করা শেয়ার তাৎক্ষণিকভাবে নগদায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছে।

তবে মানবিক দিক বিবেচনায়—মৃত্যু, মরণব্যাধি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের সুদ মওকুফের প্রক্রিয়া দ্রুত করার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে চিঠিতে।

ভয়াবহ পরিসংখ্যান ও বাস্তব চিত্র
ব্যাংকিং খাতের ভেতরের খবর বলছে, খাতা-কলমের হিসাবের চেয়ে প্রকৃত পরিস্থিতি অনেক বেশি নাজুক। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিতরণকৃত ঋণের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি খেলাপি হয়ে পড়েছে। টাকার অঙ্কে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা।

গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতের মোট ঋণের স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা, যার ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশই এখন খেলাপি। ব্যাংকাররা বলছেন, বিগত সরকারের আমলে কৃত্রিমভাবে খেলাপি ঋণের হার কম দেখানোর যে সংস্কৃতি ছিল, তা এখন বন্ধ হয়েছে। ফলে ঋণের প্রকৃত ক্ষত বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে এবং আগামীতে এই হার আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এবিবি আশা করছে, তাদের এই প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরবে এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের দৌরাত্ম্য উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts