১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ১:৫১ সোমবার বসন্তকাল
জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ইসলামপমনা ও সমমনা দলগুলোর রাজনীতিতে বড় ধরনের মেরুকরণ দৃশ্যমান হয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১০টি রাজনৈতিক দল মিলে গঠন করেছে নতুন জোট, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’। তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌতূহল জাগিয়ে রেখে এই জোট এখনই ৩০০ আসনের প্রার্থী ঘোষণা করছে না। চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে জোটে পাওয়ার আশায় তাদের জন্য ৫০টি আসন ফাঁকা রেখে বাকি ২৫০ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে এই নতুন মোর্চা।

বৃহস্পতিবার (আজ) সকালে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ১০ দলের শীর্ষ নেতাদের এক দীর্ঘ রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। আজ রাত ৮টায় রাজধানীর কাকরাইলে অবস্থিত ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ২৫০ আসনের প্রার্থী তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।
সমঝোতার রূপরেখা ও মধ্যস্থতায় মামুনুল হক
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের সম্মানে ৫০টি আসন খালি রাখার কৌশল নেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় ইসলামী আন্দোলনকে যুক্ত করতে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হককে।
বৈঠক শেষে মাওলানা মামুনুল হক সাংবাদিকদের জানান, ১০ দলের উপস্থিতিতে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ অব্যাহত আছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, শেষ পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলনকে সঙ্গে নিয়েই পূর্ণাঙ্গ জোটের ঘোষণা দেওয়া সম্ভব হবে। খেলাফত মজলিসের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মোহাম্মদ মুনতাসির আলিও একই সুর মিলিয়ে বলেন, “ইসলামী আন্দোলনের জন্য ৫০টি আসন আমরা ফাঁকা রেখেছি। তারা যদি শেষ পর্যন্ত না আসে, তবে পরবর্তীতে ওই আসনগুলোতেও প্রার্থী দেওয়া হবে।”
বৈঠকে যারা উপস্থিত ছিলেন
জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ। এছাড়া শরিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক ও মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ইউসুফ সাদিক হক্কানী, নেজামে ইসলাম পার্টির মাওলানা আব্দুল মাজেদ আতহারী এবং জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
জোটের কৌশল ও এনসিপির বক্তব্য
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জোটের কৌশলগত অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, এই ১১ দলীয় জোটের একটি বিশেষ রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে যা জনগণ অনুধাবন করতে পারছে। তিনি জানান, আসন্ন নির্বাচনে ৩০০ আসনে কোনো দলের একক প্রার্থী থাকবে না, বরং সবাই ‘জোটের প্রার্থী’ হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। দলগুলোর মধ্যে ছোটখাটো মতভিন্নতা থাকলেও বৃহত্তর স্বার্থে তা দ্রুত কেটে যাবে এবং জোট অটুট থাকবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
ইসলামী আন্দোলনের অবস্থান ও জামায়াত আমিরের বার্তা
বৈঠকে ইসলামী আন্দোলনের অনুপস্থিতি নিয়ে দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান জানান, বৈঠকের বিষয়টি তারা দেরিতে জানতে পারায় প্রস্তুতি নিয়ে অংশ নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, জামায়াতের সঙ্গে তাদের আলোচনার দরজা এখনো বন্ধ হয়নি এবং আলাদা হয়ে যাওয়ার মতো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও তারা নেননি। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অস্বস্তি থাকলেও সমঝোতার সুযোগ এখনো রয়েছে।
এদিকে, দুই দলের কর্মীদের মধ্যে যাতে কোনো ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক বার্তায় তিনি কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ইসলামী আন্দোলনের প্রতি সংহতি দেখাতে গিয়ে কেউ যেন অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিভ্রান্তিমূলক মন্তব্য না করেন। ভ্রাতৃপ্রতিম এই দলের প্রতি সম্মান বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।
সব মিলিয়ে, রাত ৮টার সংবাদ সম্মেলনের দিকেই এখন সবার দৃষ্টি। ইসলামী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত এই ৫০ আসনের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’-এ শামিল হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
Analysis | Habibur Rahman