.
আন্তর্জাতিক

ইসরায়েলের দেয়াল নির্মাণ: লেবাননের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন ও জাতিসংঘের সতর্কতা।

Email :48

১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ১:৫১ সোমবার বসন্তকাল

যুদ্ধবিরতির নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দক্ষিণ লেবাননের মাটিতে এখন শোনা যাচ্ছে ভারী যন্ত্রপাতির শব্দ। এটি কোনো পুনর্নির্মাণের কাজ নয়, বরং এক নতুন সংঘাতের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন। মার্কিন মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে পাশ কাটিয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী লেবাননের সার্বভৌম ভূখণ্ডে কংক্রিটের দেয়াল নির্মাণ শুরু করেছে, যা এই অঞ্চলের ভঙ্গুর শান্তিকে এক নতুন প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।


আন্তর্জাতিক সীমান্তরেখা বা ‘ব্লু লাইন’-কে কেবল উপেক্ষা করেই নয়, রীতিমতো পদদলিত করে ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের গভীরে তাদের নির্মাণযজ্ঞ চালাচ্ছে। মারুন আল-রাস ও আইতারুনের মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর বিপরীতে এই দেয়াল তোলা হচ্ছে, যা লেবানিজ ভূখণ্ডের প্রায় ১ থেকে ২ কিলোমিটার ভেতরে অবস্থিত।

এই অভিযোগ কোনো একপাক্ষিক দাবি নয়, এর সত্যতা নিশ্চিত করেছে খোদ জাতিসংঘ। লেবাননে নিযুক্ত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী (UNIFIL) পর্যবেক্ষণ করে জানিয়েছে, ইয়ারুন শহরের কাছে নির্মিত এই কংক্রিটের দেয়ালটি স্পষ্টভাবে ব্লু লাইন অতিক্রম করেছে। এর ফলে প্রায় ৪,০০০ বর্গমিটারেরও বেশি লেবানিজ ভূমি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, যা কার্যত এক নীরব দখলদারিত্বের সামিল।

ইসরায়েলি ভাষ্যমতে, এই নির্মাণকাজ তাদের নিরাপত্তার জন্য জরুরি এবং এটি এমন পাঁচটি “কৌশলগত স্থানের” অংশ যা তারা এখনও নিজেদের দখলে রেখেছে। তাদের দাবি, হিজবুল্লাহ সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত তারা এই এলাকাগুলো থেকে সরবে না—যা নভেম্বরে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। চুক্তি অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনীর লেবানন থেকে পূর্ণ প্রত্যাহারের কথা ছিল।

UNIFIL অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বলেছে, “লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সেনা উপস্থিতি এবং যেকোনো ধরনের নির্মাণকাজ সরাসরি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রেজোলিউশন ১৭০১ এবং লেবাননের সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।”

এই পরিস্থিতিতে লেবাননের সরকার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানালেও তাদের হাত-পা কার্যত বাঁধা। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম এই সামরিক কর্মকাণ্ড বন্ধের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আবেদন জানিয়েছেন এবং এটিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

দেয়াল নির্মাণের এই আগ্রাসী পদক্ষেপের পাশাপাশি থেমে নেই সহিংসতা। যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরায়েলি বিমান হামলায় দক্ষিণ লেবাননে শত শত বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। আইতারুন ও হাউলার মতো শহরগুলোতে বহু বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যা একটি সম্মিলিত শাস্তির শামিল।


বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি ইসরায়েলের একটি সুচিন্তিত পদক্ষেপ। লেবাননের داخلی রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ভঙ্গুর অর্থনৈতিক দশাকে পুঁজি করে ইসরায়েল সীমান্তে একটি “নতুন বাস্তবতা” চাপিয়ে দিতে চাইছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দুর্বল প্রতিক্রিয়ার সুযোগে তারা ধীরে ধীরে ভূখণ্ড গ্রাস করার এক নতুন কৌশল অবলম্বন করেছে। এই দেয়াল নিছক একটি সীমান্ত প্রাচীর নয়, বরং লেবাননের সার্বভৌমত্বের কফিনে পেরেক ঠুকে দেওয়ার এক বিপজ্জনক ইঙ্গিত, যা भविष्यে আরও বড় সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts