১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ৪ঠা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৪ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ২:৪৪ বুধবার বসন্তকাল
ইরানের বিচারিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী হলো বিশ্ব। মাত্র দুই দিনের সংক্ষিপ্ত বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২৬ বছর বয়সী এক তরুণকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা শোনানো হয়েছে। সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে আটক এরফান সোলতানি নামের ওই তরুণের ফাঁসি আজ বুধবার (১৪ জানুয়ারি) কার্যকর করার কথা রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ভয়ভীতি প্রদর্শনের কৌশল হিসেবেই এত দ্রুততম সময়ে এই রায় দেওয়া হয়েছে।

কে এই এরফান?
ইরানের রাজধানী তেহরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কারাজের ফারদিস এলাকার বাসিন্দা এরফান সোলতানি। ২৬ বছর বয়সী এই তরুণ গত বৃহস্পতিবার নিজ বাড়ি থেকেই গ্রেপ্তার হন। ওই সময় শহরটিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চরম আকার ধারণ করেছিল এবং এরপরপরই ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় প্রশাসন। সাধারণ এক তরুণ থেকে হঠাৎ করেই তিনি হয়ে ওঠেন রাষ্ট্রযন্ত্রের দমন-পীড়নের অন্যতম প্রতীক।
বিদ্যুতগতির বিচার নাকি প্রহসন?
নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘হেনগো অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস’ এই ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। সংস্থাটির তথ্যমতে, গত বৃহস্পতিবার এরফানকে গ্রেপ্তারের পর রোববারই তাঁর পরিবারকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে বিচার প্রক্রিয়া শেষ। রায়ে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
গ্রেপ্তার এবং রায়ের মধ্যবর্তী সময় ছিল মাত্র দুই দিন। হেনগো অর্গানাইজেশনের মুখপাত্র আওয়ার শেখি হতাশা প্রকাশ করে বিবিসিকে জানান, এত দ্রুত কোনো মামলার বিচারকাজ শেষ হতে তারা আগে কখনো দেখেননি। নিহতের এক স্বজন বিবিসি ফারসিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, আদালত ‘অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে’ এই রায় দিয়েছে, যা স্বাভাবিক বিচারিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থী।
বোনের আর্তনাদ ও ১০ মিনিটের বিদায়
এই ঘটনার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক হলো এরফানের আইনি লড়াইয়ের সুযোগ থেকে বঞ্চনা। জানা গেছে, এরফানের নিজের বোন ইরানের একজন নিবন্ধিত আইনজীবী। তিনি ভাইয়ের হয়ে আইনি লড়াই লড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইরানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাকে মামলার কোনো নথিপত্রই দেখতে দেয়নি, এমনকি ভাইয়ের হয়ে আদালতে দাঁড়াতেও বাধা দেওয়া হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে শেষবারের মতো পরিবারের সদস্যদের দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই সাক্ষাতের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ১০ মিনিট। ভারতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য সানডে গার্ডিয়ান’-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই নির্মম বিদায়ের চিত্র।
রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভ ও আন্তর্জাতিক চাপ
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন ২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় রূপ ধারণ করেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দাবিতে পরিণত হয়েছে। গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৫৭১ জন বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি’। নিহতদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও ১২টি শিশুও রয়েছে।
এদিকে টানা পাঁচ দিন ধরে ইরানে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় দেশটির প্রকৃত চিত্র বহির্বিশ্বের কাছে অস্পষ্ট। ইরান সরকার এই অস্থিরতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করলেও আন্তর্জাতিক মহল এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দেওয়া শুরু করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ‘অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা’ গ্রহণ করবে।
মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ
হেনগো অর্গানাইজেশনের মতে, এরফানের এই মামলাটি প্রমাণ করে যে ইরান সরকার ভীতি প্রদর্শনের জন্য যেকোনো পর্যায়ে যেতে প্রস্তুত। আইনি সহায়তা পাওয়ার মৌলিক অধিকার হরণ করে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার এই ঘটনাকে ‘রাষ্ট্রীয় হত্যা’ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। আজ বুধবার এই সাজা কার্যকর হলে তা ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতির ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে।
Analysis | Habibur Rahman