.
আন্তর্জাতিক

ইরানে তথ্যের আঁধারে লাশের পাহাড়: নিহতের সংখ্যা ৬ হাজার ছুঁইছুঁই, যাচাই চলছে আরও ১৭ হাজারের

Email :20

১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৩:৪৬ সোমবার বসন্তকাল

ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে নজিরবিহীন কঠোর অবস্থান নিয়েছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে গোটা বিশ্ব থেকে দেশকে কার্যত আলাদা করে ফেলার মধ্যেই সেখানে চলছে রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়ন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি’ (এইচআরএএনএ)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজারে পৌঁছেছে। তবে শঙ্কা করা হচ্ছে, এই সংখ্যা হিমশৈলের চূড়ামাত্র; প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ।

ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ইরানের এবারের আন্দোলনের প্রকৃত চিত্র জানা যায়নিছবি: রয়টার্স

রক্তাক্ত পরিসংখ্যান ও যাচাইয়ের চ্যালেঞ্জ
এইচআরএএনএ তাদের প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছে যে, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে এখন পর্যন্ত ৫ হাজার ৮৪৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের এই দীর্ঘ তালিকায় রয়েছে ৭৭ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু ও কিশোর। সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ৫ হাজার ৫২০ জনই সাধারণ বিক্ষোভকারী। এ ছাড়া সংঘর্ষে ২০৯ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং ৪২ জন সাধারণ পথচারী নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

সবচেয়ে আঁতকে ওঠার মতো বিষয় হলো, সংস্থাটি আরও ১৭ হাজার ৯১ জনের মৃত্যুর খবর পেয়েছে, যা বর্তমানে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলের তথ্য পেতে দেরি হওয়ায় এই সংখ্যা চূড়ান্ত করতে সময় লাগছে। একই সঙ্গে ধরপাকড়ের মহোৎসব চলছে দেশজুড়ে, যেখানে অন্তত ৪১ হাজার ২৮৩ জন নাগরিককে গ্রেপ্তারের তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে।

ডিজিটাল অন্ধকারের সুযোগ
গত ১৮ দিন ধরে ইরানে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায় দেশটির ভেতরের খবর বাইরে আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। লন্ডনভিত্তিক ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘নেটব্লকস’ জানিয়েছে, ইরান সরকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইন্টারনেট শাটডাউন করে রেখেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চালানো প্রাণঘাতী অভিযানের প্রমাণ লোপাট এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চোখের আড়ালে দমন-পীড়ন চালাতেই এই ডিজিটাল আঁধার তৈরি করা হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, যোগাযোগের এই বিচ্ছিন্নতা তাদের তথ্য সংগ্রহের কাজকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

সরকারি ভাষ্য বনাম বাস্তবতা
দীর্ঘ নীরবতার পর ইরান সরকার প্রথমবারের মতো হতাহতের সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। দেশটির ‘ফাউন্ডেশন ফর মার্টার্স অ্যান্ড ভেটেরান্স’-এর দাবি অনুযায়ী, সহিংসতায় ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন। তবে সরকার তাদের নিজেদের মতো করে এই মৃত্যুর শ্রেণিবিভাগ করেছে। তারা ২ হাজার ৪২৭ জনকে ‘শহীদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে, যাদের মধ্যে নিরাপত্তা সদস্য ও তাদের ভাষায় ‘নিরপরাধ পথচারী’ রয়েছেন। বাকিদের তারা যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ‘দাঙ্গাবাজ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার ভিন্ন দাবি
সরকারি হিসাবের সঙ্গে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যের আকাশ-পাতাল পার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নরওয়েভিত্তিক এনজিও ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ (আইএইচআর) জানিয়েছে, তারা ৩ হাজার ৪২৮ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। তবে তাদের হুঁশিয়ারি, চূড়ান্ত নিহতের সংখ্যা ২৫ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

অন্যদিকে, প্রবাসী ইরানিদের দ্বারা পরিচালিত সংবাদমাধ্যম ‘ইরান ইন্টারন্যাশনাল’ আরও ভয়াবহ দাবি করেছে। তাদের মতে, কেবল ৮ ও ৯ জানুয়ারি—এই দুই দিনেই নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ৩৬ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে এত বড় সংখ্যার সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অর্থনৈতিক ক্ষোভ থেকে গণবিস্ফোরণ
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মুখে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। শুরুতে এটি জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হলেও, খুব দ্রুতই তা সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনে রূপ নেয়। ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি থেকে আন্দোলনটি চরম আকার ধারণ করে এবং দেশটির বড় শহরগুলোতে টানা বিক্ষোভ চলতে থাকে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর অভিযোগ, এই বিক্ষোভ দমনে ইরানি কর্তৃপক্ষ সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছে, যার ফলে আপাতত রাজপথ কিছুটা শান্ত মনে হলেও ভেতরে-ভেতরে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে।

ইরানের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Analysis | Habibur Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts