১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১১:১২ বৃহস্পতিবার শীতকাল
অর্থনৈতিক সংকট ও নানা দাবিতে গত রোববার তেহরানের দোকানদার ও ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন ইরানের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। একদিকে ইন্টারনেট সেবায় ব্যাপক বিঘ্ন ঘটানো হচ্ছে, অন্যদিকে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। এখন পর্যন্ত বিক্ষোভে অন্তত ১০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

ইন্টারনেট বিভ্রাট ও সাইবার হামলার দাবি
বিক্ষোভের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানে ইন্টারনেট পরিষেবায় ধস নেমেছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে দেশটির নাগরিকরা মোবাইল ডেটা ও ব্রডব্যান্ড সংযোগে ব্যাপক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও সাইবার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষক ‘ক্লাউডফ্লেয়ার’-এর তথ্যমতে, ইরানে গত কয়েক দিনের তুলনায় ইন্টারনেট ট্রাফিক বা ব্যবহারের হার প্রায় ৩৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ অবশ্য ইন্টারনেট সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার কথা স্বীকার করেনি। তবে দেশটির তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিমন্ত্রী সাত্তার হাশেমি দাবি করেছেন, রোববার ইরান সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ সাইবার হামলার শিকার হয়েছে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “বিশাল এই সাইবার হামলা প্রতিহত করার কারণেই সম্ভবত ইন্টারনেটের ব্যান্ডউইডথ বা গতি সীমিত হয়ে গেছে।”
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি ইরান সরকারের পুরোনো কৌশল। এর আগে গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের সময় এবং পূর্ববর্তী বিভিন্ন বিক্ষোভের সময়ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন বা ধীর করে দেওয়া হয়েছিল, যাতে নাগরিকরা কেবল অভ্যন্তরীণ ‘ইন্ট্রানেট’ ব্যবহারে বাধ্য হন এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারেন।
মাঠপর্যায়ের সংঘাত ও প্রাণহানি
বিক্ষোভ এখন আর তেহরানে সীমাবদ্ধ নেই, তা ফাসা, হামেদান, কোম এবং ইলামের মতো শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। ফাসা শহরে উত্তেজিত জনতা একটি সরকারি ভবনের মূল ফটক ভেঙে ফেলার চেষ্টা চালায় বলে খবর পাওয়া গেছে।
বিক্ষোভে সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনাও বাড়ছে। পশ্চিম ইরানের হামেদান শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতির মধ্যেই এক তরুণ ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। তবে হামেদানের গভর্নরের কার্যালয়ের নিরাপত্তা বিষয়ক উপপ্রধান হামজেহ আমরাই এই মৃত্যুকে ‘সন্দেহজনক’ আখ্যা দিয়ে দাবি করেছেন, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে ‘শত্রুপক্ষ’ এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
এদিকে, পবিত্র নগরী হিসেবে পরিচিত কোমে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছে। কোমের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোর্তেজা হায়দারি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করলেও এর দায় চাপিয়েছেন ‘শত্রুদের’ ওপর। এ ছাড়া সেখানে গ্রেনেড বিস্ফোরণে এক ব্যক্তি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যাকে কর্তৃপক্ষ ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্য’ বলে অভিহিত করেছে।
অন্যদিকে, ইলাম প্রদেশের মালেকশাহি এলাকায় মুখোশধারী বন্দুকধারীদের হামলায় ‘ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)-এর এক প্রবীণ সদস্য নিহত হয়েছেন। ফার্স নিউজের তথ্যমতে, ওই শহরে সব মিলিয়ে তিনজন নিহত হয়েছেন।
খামেনির হুঁশিয়ারি ও রাজনৈতিক উত্তাপ
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কঠোর বার্তা দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। চলমান অস্থিরতার জন্য তিনি বিদেশি প্রভাবকে দায়ী করেছেন। এক ভাষণে তিনি বলেন, “যারা দাঙ্গা সৃষ্টি করছে, তাদের অবশ্যই উপযুক্ত শিক্ষা দিতে হবে।” সরকারের পক্ষ থেকে পাল্টা বিক্ষোভ-সমাবেশের আয়োজনও করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে আইআরজিসি পশ্চিমাঞ্চলীয় লোরেস্তান প্রদেশের খোররামাবাদ থেকে বিক্ষোভের ইন্ধনদাতা সন্দেহে তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে আটককৃত কয়েকজনের চোখ বাঁধা স্বীকারোক্তি প্রচার করা হয়েছে, যেখানে তারা বিদেশি এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং সশস্ত্র থাকার কথা ‘স্বীকার’ করেছেন।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বাকযুদ্ধ
ইরানের এই অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতিও। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে মন্তব্য করে বলেছেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘উদ্ধারে এগিয়ে আসবে’।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে বলেছেন, “যারা গাজায় নারী ও শিশুদের ওপর ইসরায়েলি গণহত্যায় সমর্থন দিচ্ছে, তাদের মুখে আমাদের সংযত হওয়ার পরামর্শ মানায় না।” গাজায় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি চললেও, পেজেশকিয়ান ওয়াশিংটনের ‘দ্বিমুখী আচরণের’ কঠোর সমালোচনা করেন।
সব মিলিয়ে, বিক্ষোভ, দমনপীড়ন এবং আন্তর্জাতিক চাপে ইরানে পরিস্থিতি অত্যন্ত থমথমে এবং জটিল আকার ধারণ করেছে।
Analysis | Habibur Rahman
