১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি রাত ৩:৪৩ বৃহস্পতিবার শীতকাল
পশ্চিমাদের আলোচনার প্রস্তাবকে কার্যত আবর্জনায় ছুড়ে ফেলে ভূ-রাজনৈতিক দাবার বোর্ডে নতুন চাল দিয়েছে ইরান। বিধ্বংসী সামরিক হামলার পরও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একচুলও ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে,未来的 আলোচনার केंद्रবিন্দু ওয়াশিংটন বা ভিয়েনা নয়, বরং মস্কো ও বেইজিং। এটি শুধু একটি কূটনৈতিক অচলাবস্থা নয়, বরং পশ্চিমা বিশ্বের বিপরীতে একটি নতুন শক্তিশালী অক্ষের উত্থানের ইঙ্গিত, যা পারমাণবিক সংকটকে এক নতুন এবং আরও বিপজ্জনক অধ্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।
গেল জুন মাসে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বিত হামলায় তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এই প্রথম ইরান স্বীকার করেছে যে, তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। কিন্তু এই স্বীকারোক্তিকে দুর্বলতা হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এক বিস্ফোরক মন্তব্যে বলেছেন, “সামরিক পথে ব্যর্থ হয়েই পশ্চিমা বিশ্ব এখন আলোচনার জন্য হাত পাতছে।” তার মতে, এই আলোচনা সমতার ভিত্তিতে নয়, বরং চাপিয়ে দেওয়ার একটি কৌশল মাত্র, যা ইরান আর গ্রহণ করবে না।
এই কঠোর অবস্থানের পেছনের শক্তি হলো রাশিয়া এবং চীন। পশ্চিমা বিশ্ব যখন জাতিসংঘের “স্ন্যাপব্যাক” নিষেধাজ্ঞা ফিরিয়ে এনে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) মাধ্যমে নতুন প্রস্তাব এনে ইরানকে একঘরে করার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই তেহরানের পাশে প্রকাশ্য ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে এই দুই বিশ্বশক্তি। তারা কেবল নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধেই অবস্থান নেয়নি, বরং জাতিসংঘের কাছে যৌথ চিঠি দিয়ে জানিয়েছে যে, ইরানের পারমাণবিক ইস্যুটি নিরাপত্তা পরিষদের বিবেচনার বাইরে থাকা উচিত। এর চেয়েও বড় পদক্ষেপ হলো, রাশিয়ায় ইরানে আরও আটটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ঘোষণা, যা পশ্চিমা চাপকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলী লারিজানির কথায় এই নতুন আত্মবিশ্বাসের প্রতিধ্বনি শোনা যায়, যিনি বলেছেন, “পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের বিনিময়ে হলেও ইরান তার পথ থেকে সরবে না।” এই হুমকি এখন আর ফাঁকা বুলি নয়, কারণ তেহরান এখন জানে যে তাদের পেছনে এমন শক্তি রয়েছে যারা পশ্চিমা বিশ্বের একাধিপত্যকে স্বীকার করে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের “অপারেশন মিডনাইট হ্যামার” ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার ভৌত কাঠামোর ক্ষতি করতে পারলেও, দেশটির কৌশলগত চিন্তাভাবনাকে আরও শক্তিশালী করেছে। ইরান এখন পশ্চিমা বিশ্বের সাথে দর-কষাকষির পরিবর্তে রাশিয়া ও চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার অংশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
সুতরাং, পরিস্থিতি এখন আর কেবল ইরান বনাম পশ্চিমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন একটি ত্রিপক্ষীয় স্নায়ুযুদ্ধের রূপ নিয়েছে, যেখানে এক পক্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা এবং অন্য পক্ষে রয়েছে ইরান, রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান জোট। এই নতুন মেরুকরণ কি পারমাণবিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলবে, নাকি আলোচনার জন্য নতুন একটি পথ খুলে দেবে—বিশ্ব এখন সেই বিপজ্জনক অচলাবস্থার সামনেই দাঁড়িয়ে।
Analysis | Habibur Rahman


