১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি দুপুর ১:৪২ সোমবার বসন্তকাল
ইউরোপের আকাশ হঠাৎ করেই যেন এক নীরব অবিশ্বাসের চাদরে ঢেকে গেছে। ব্রাসেলস থেকে স্টকহোম, মহাদেশের ব্যস্ততম বিমানবন্দরগুলোর স্বাভাবিক কোলাহল থেমে যাচ্ছে আকাশে ভেসে ওঠা কয়েকটি অচেনা বিন্দুর কারণে। এগুলো কোনো সাধারণ ড্রোন নয়; বরং এক অজানা শক্তির পাঠানো নীরব বার্তা, যা ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। একই সময়ে, বেলজিয়ামের যে সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন পারমাণবিক অস্ত্রের অস্তিত্ব নিয়ে জল্পনা রয়েছে, তার আকাশেও এই রহস্যময় ড্রোনের আনাগোনা দেখা গেছে। এই ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন কাকতালীয় বিষয় নয়, বরং এক নতুন ধরনের সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্র আর সীমান্ত নয়, বরং আমাদের মাথার উপরের আকাশ।
ঘটনার গভীরে: পরিকল্পিত অভিযান, শখের উড্ডয়ন নয়
বেলজিয়াম ও সুইডেনের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা একমত যে, এই ড্রোন উড্ডয়ন কোনো শৌখিন চালকের ভুল নয়, বরং এক সুসংগঠিত ও পরিকল্পিত অভিযানের স্পষ্ট ছাপ। একাধিক ড্রোন একসাথে নির্দিষ্ট ফরমেশনে উড়েছে, যা একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে, এই ড্রোনগুলো দিয়ে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি নিরীক্ষণের মতো জটিল কাজও করা হয়েছে। এর মানে হলো, যারা এই ড্রোনগুলো পরিচালনা করছে, তাদের উদ্দেশ্য শুধু ছবি তোলা বা ভিডিও করা নয়, বরং ইউরোপের বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, রাডার নেটওয়ার্ক এবং সামরিক যোগাযোগের সক্ষমতা পরীক্ষা করা। তারা দেখতে চাইছে, ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত এবং এর দুর্বলতাগুলো ঠিক কোথায়।
নেপথ্যের কৌশল: ‘গ্রে-জোন’ সংঘাতের নতুন অধ্যায়
সামরিক বিশ্লেষকরা একে বলছেন ‘গ্রে-জোন’ বা ‘হাইব্রিড’ সংঘাতের এক নতুন অধ্যায়। এর মূল দর্শন হলো, সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা না করে, প্রতিপক্ষকে costante চাপে রাখা, তাদের সম্পদ ও মনোযোগ অন্য দিকে সরিয়ে দেওয়া এবং সমাজে বিভ্রান্তি ও ভীতি তৈরি করা। কোনো গোলা বা বোমা খরচ না করেই একটি দেশের বিমানবন্দর অচল করে দেওয়া বা পারমাণবিক স্থাপনার মতো স্পর্শকাতর জায়গায় অনুপ্রবেশের বার্তা দেওয়া—এই কৌশলের সবচেয়ে বড় শক্তি। এতে প্রতিপক্ষ পাল্টা আক্রমণের সুযোগ পায় না, কারণ আক্রমণকারীর পরিচয় নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব।
অনেক বিশেষজ্ঞের সন্দেহের তীর রাশিয়ার দিকে। যদিও এর কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ এখনো মেলেনি, তবে এই ধরনের ‘অস্বীকারযোগ্য’ (deniable) অভিযান পরিচালনা করা এবং কম খরচে প্রতিপক্ষকে ব্যতিব্যস্ত রাখার কৌশল রাশিয়ার আধুনিক সামরিক মতবাদের একটি অংশ। এই অভিযান সরাসরি মস্কোর নির্দেশে না হলেও, তাদের মদদপুষ্ট কোনো গোষ্ঠীর মাধ্যমেও পরিচালিত হতে পারে, যা তাদের কৌশলগত উদ্দেশ্য পূরণ করবে।
বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিকতা ও আগামীর প্রস্তুতি
ইউরোপের এই ঘটনা কেবল দূর মহাদেশের কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, বরং এটি ভবিষ্যতের যুদ্ধের একটি অশনিসংকেত। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ভৌগোলিক দূরত্ব এখন আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না। কম খরচের ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে যেকোনো রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী বিশ্বের যেকোনো দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো (KPI), যেমন—বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সমুদ্রবন্দর বা সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।
বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আমাদের বিমানবন্দর ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর সুরক্ষায় এখনই মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। শুধুমাত্র প্রথাগত নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর নির্ভর না করে, আমাদের জরুরি ভিত্তিতে ‘কাউন্টার-ড্রোন’ প্রযুক্তি, যেমন—রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি জ্যামার, বিশেষায়িত রাডার এবং লেজার সিস্টেমের উপর বিনিয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি, এই ধরনের অদৃশ্য হুমকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং যৌথ সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই।
কারণ আজকের এই ছোটখাটো মহড়া, ভবিষ্যতের বড় কোনো সংঘাতের পূর্বাভাসও হতে পারে।
Analysis | Habibur Rahman


