১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:৩৭ বৃহস্পতিবার শীতকাল
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম আইকনিক চরিত্র এবং আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া প্রথম শহীদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রমে বড় অগ্রগতি হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা এই চাঞ্চল্যকর মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। মামলার পরবর্তী ধাপ হিসেবে আগামী ২০ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) উপস্থাপনের দিন ধার্য করেছেন আদালত।

আজ বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ এই মামলার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
আদালতে যা হলো
এদিন ট্রাইব্যুনালে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার জেরা সম্পন্ন হয়। ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম নিশ্চিত করেন যে, রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের সাক্ষ্য-জেরা পর্ব সমাপ্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে মামলাটি এখন চূড়ান্ত নিষ্পত্তির দিকে এগিয়ে গেল। আগামী ২০ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তিতর্কের মাধ্যমে উভয় পক্ষ তাদের আইনি ব্যাখ্যা ও দলিলাদি বিচারকদের সামনে তুলে ধরবেন।
আসামিদের অবস্থান
আবু সাঈদ হত্যা মামলায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মো. হাসিবুর রশীদসহ মোট ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে সাবেক উপাচার্যসহ ২৪ জন আসামি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
আজকের শুনানিকালে কারাগারে আটক থাকা ৬ আসামিকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। এই ছয়জন হলেন:
১. রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম।
২. সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান।
৩. রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের চুক্তিভিত্তিক সাবেক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ।
৪. পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন।
৫. সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়।
৬. নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা ইমরান চৌধুরী (ওরফে আকাশ)।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও মামলার ইতিবৃত্ত
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই—এই দিনটি বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। রংপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, নিরস্ত্র আবু সাঈদ পুলিশের বন্দুকের নলের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই পুলিশ তাকে লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি চালায়। মাটিতে লুটিয়ে পড়া সাঈদের এই দৃশ্য দেশজুড়ে প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে দেয়, যা পরবর্তীতে সরকারের পতন ও গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ২০২৫ সালের ২৪ জুন ৩০ জনকে অভিযুক্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। এরপর গত ৬ আগস্ট ট্রাইব্যুনাল আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন। এর আগে, ২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট থেকে এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার কাজ শুরু হয়েছিল।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে এখন মামলাটি রায়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। ২০ জানুয়ারি শুরু হতে যাওয়া যুক্তিতর্কের পরেই ট্রাইব্যুনাল এই ঐতিহাসিক মামলার রায় ঘোষণা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
Analysis | Habibur Rahman