৭ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২১শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১লা শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি বিকাল ৩:৫০ শনিবার বসন্তকাল
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে ইতিবাচক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। তিনি মনে করেন, অতীতের পরিসংখ্যান ও বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এবারের নির্বাচনে ৫৫ শতাংশের বেশি ভোট পড়তে পারে। একইসঙ্গে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়যুক্ত হবে বলেও তিনি প্রত্যাশা করেন।
রবিবার (আজ) রাজধানীর একটি হোটেলে নির্বাচন কভার করা সাংবাদিকদের জন্য আয়োজিত দুই দিনব্যাপী এক প্রশিক্ষণ কর্মশালার সমাপনী অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন। এমআরডিআই-এর সহযোগিতায় এই কর্মশালার আয়োজন করে ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ডিকাব)।
‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের রাজনীতি ও দলীয় অবস্থান
নির্বাচন ও সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, সরকার দীর্ঘ এক বছর ধরে বিভিন্ন কমিশনের মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাবনা তৈরি করেছে এবং সরকার চায় গণভোটে জনগণ এর পক্ষে রায় দিক। তিনি বলেন, “বুঝে হোক বা না বুঝে, কিছু জায়গায় ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চলছিল। তবে সরকার সংস্কার বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর।”
ভোটারদের আচরণের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তৌহিদ হোসেন বলেন, সাধারণ মানুষ সংস্কারের জটিল শর্তাবলী পড়ে ভোটকেন্দ্রে যাবেন না, বরং তারা নিজ নিজ দলের নির্দেশনা বা ‘পার্টি লাইন’ অনুসরণ করবেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বিএনপিকে নিয়ে শুরুতে কিছুটা অস্পষ্টতা (এম্বুগিউটি) ছিল। স্থানীয় পর্যায়ের দু-একজন নেতা ভিন্ন সুর তুললেও, গতকাল দলটির চেয়ারম্যান ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেওয়ায় সেই বিভ্রান্তি কেটে গেছে। যেহেতু প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ইতিবাচক অবস্থানে আছে, তাই বড় কোনো সমস্যার আশঙ্কা নেই।”
১৯৯১-এর প্রসঙ্গ ও ভোটের হার
নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা অতীতের উদাহরণ টেনে আনেন। তিনি বলেন, প্রতি নির্বাচনেই কিছু মানুষ ভোটদানে বিরত থাকেন, যা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে ৫৫ শতাংশ ভোট পড়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমার ব্যক্তিগত ধারণা, এবারের নির্বাচনে সেই হার অতিক্রম করবে এবং ৫৫ শতাংশের বেশি মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।”
নির্বাচনী পরিবেশ সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেন যে, কোনো নির্বাচনই সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ বা সংঘাতহীন হয় না। ১৯৯১ সালের নির্বাচনকেও অনেকে শান্তিপূর্ণ মনে করলেও বাস্তবে সেখানেও কিছু অস্থিরতা ছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতেও কিছু অস্থিরতা থাকা স্বাভাবিক বলে তিনি মত দেন।
কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ ও সংস্কৃতি
নির্বাচনে বিদেশি কূটনীতিকদের হস্তক্ষেপ বা মন্তব্যের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি অংশে পরিণত হয়েছে। তিনি মন্তব্য করেন, “আমাদের সমাজের একটি বড় অংশ এবং গণমাধ্যমও চায় কূটনীতিকরা কথা বলুক। এটি এখন একটি প্রথা বা ‘ট্র্যাডিশন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এর দায় কেবল কূটনীতিকদের ওপর চাপানো যায় না।” তবে বিদেশিদের উদ্বেগ নিরসনে সরকার যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি জানান।
পাসপাসপোর্ট ইস্যু নিয়ে বিভ্রান্তি নিরসন
সম্প্রতি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ও তার স্ত্রীর কূটনৈতিক পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া নিয়ে যে গুঞ্জন উঠেছিল, তা সরাসরি নাকচ করে দেন তৌহিদ হোসেন। তিনি স্পষ্ট করেন, “মেয়াদ থাকাকালে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বা উপদেষ্টার পাসপোর্ট হস্তান্তর করা খুবই অস্বাভাবিক ঘটনা। আমি এবং আমার স্ত্রী আমাদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট যথারীতি বহাল রেখেছি।” তবে ভিসা প্রাপ্তির সুবিধার্থে অন্য কোনো মন্ত্রী এমনটি করে থাকতে পারেন বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও অন্যান্য
অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার উপস্থিত ছিলেন। তিনি তার বক্তব্যে নির্বাচনের সময় সাংবাদিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন। বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নারী প্রার্থী ও সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
সমাপনী এই অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন এমআরডিআই-এর নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান, ডিকাব সভাপতি এ কে এম মঈনুদ্দিন এবং সাধারণ সম্পাদক আবু হেনা ইমরুল কায়েস।
Analysis | Habibur Rahman
