১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি সকাল ১০:১৩ সোমবার বসন্তকাল
রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ যখন প্রায়ই ওঠানামা করে, তখন ক্ষমতাসীন দলের যেকোনো কর্মসূচিকে ঘিরে প্রশাসনের নিরুদ্বেগ ও আত্মবিশ্বাসী মনোভাব এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে যখন বিরোধী শিবিরের কর্মসূচিতে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত মেলে, তখন আওয়ামী লীগের ঘোষিত কর্মসূচি নিয়ে কর্তৃপক্ষের ‘নির্ভয়’ বার্তা কি কেবলই আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সক্ষমতা, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনো রাজনৈতিক সংকেত?
আওয়ামী লীগের ঘোষিত কর্মসূচি নিয়ে কোনো ধরনের আশঙ্কা নেই—সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এমন একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে, যা প্রচলিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় বেশ ব্যতিক্রমী। সাধারণত, বড় কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির আগে জনমনে এক ধরনের উদ্বেগ কাজ করে, কিন্তু এবার প্রশাসন দৃশ্যত অনেক বেশি স্থির ও নিয়ন্ত্রিত একটি বার্তা দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আত্মবিশ্বাসের পেছনে কয়েকটি স্তর রয়েছে।
প্রথমত, ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে বিশৃঙ্খলা ঘটার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম। দলের নেতাকর্মীরা সাধারণত একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে থেকে শক্তি প্রদর্শন করতে চায়, যা সরকারের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করবে না। প্রশাসন এই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত, এবং তারা জানে যে কর্মসূচির লাগাম দলের হাতেই থাকবে। ফলে, বাহ্যিক কঠোরতা বজায় রাখলেও ভেতরে ভেতরে তারা অনেকটাই স্বস্তিতে থাকে।
দ্বিতীয়ত, এটি বিরোধী দলগুলোর জন্য একটি পরোক্ষ কিন্তু শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক বার্তা। প্রশাসন যখন ক্ষমতাসীন দলের কর্মসূচিতে নিরুদ্বেগ থাকে, তখন এটি একটি বার্তা দেয় যে, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয় যে, যেকোনো ‘নিয়ন্ত্রিত’ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে তারা স্বাগত জানায়, কিন্তু এর বাইরে গেলেই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এটি প্রকারান্তরে বিরোধী দলগুলোর কর্মসূচির সঙ্গে একটি মনস্তাত্ত্বিক বিভাজন রেখা তৈরি করে।
আওয়ামী লীগের ভেতরে বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত মতবিরোধ থাকলেও, দলীয় কর্মসূচিতে তা বড় ধরনের কোনো অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে না—এমন একটি বিশ্বাস প্রশাসনের রয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত একটি অলিখিত বোঝাপড়া কাজ করে যে, দলীয় কর্মসূচির সাফল্য বা ব্যর্থতা পুরো দলের ওপর বর্তায়। তাই অভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যাকে কেন্দ্র করে কর্মসূচি ভণ্ডুল হওয়ার আশঙ্কা ক্ষীণ।
সুতরাং, আওয়ামী লীগের কর্মসূচি নিয়ে প্রশাসনের ‘নির্ভয়’ মনোভাব কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রস্তুতির প্রকাশ নয়, বরং এটি একটি সুচিন্তিত রাজনৈতিক কৌশল। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরা হচ্ছে, তেমনই প্রতিপক্ষকে একটি সূক্ষ্ম বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে, রাজনীতির মাঠের নিয়ন্ত্রক কে। তাই এই কর্মসূচিগুলো নিষিদ্ধ বা বন্ধ করার প্রশ্নটি অবান্তর; বরং এটি নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখার একটি বৃহত্তর পরিকল্পনারই অংশ।
Analysis | Habibur Rahman


