১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি ভোর ৫:৫৬ বৃহস্পতিবার শীতকাল
রাজধানীর অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত গুলশানেও যে মধ্যযুগীয় বর্বরতা ঘটতে পারে, তারই ভয়ংকর প্রমাণ মিলেছে সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে। শীতের সকালে এক নারীকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে বারবার ঠান্ডা পানি ঢেলে নির্যাতনের সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, শীতের পোশাক পরা এক নারী অসহায়ভাবে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা। দুজন ব্যক্তি ছোট বালতি ও মগ দিয়ে তাঁর গায়ে পানি ঢালছে। প্রচণ্ড ঠান্ডায় নারীর শরীর কেঁপে উঠছে, মুখভঙ্গি স্পষ্ট করে তাঁর যন্ত্রণার কথা বলছে। অথচ নির্যাতনকারীদের মুখে কোনো অনুশোচনা নেই—বরং হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে তারা এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আশপাশে কয়েকজন দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছে, আর একজন পুরো ঘটনাটি মুঠোফোনে ধারণ করছে।
চুরির অভিযোগে ‘নিজস্ব শাস্তি’
ভিডিওটি অনুসন্ধান করে জানা যায়, ঘটনাটি ঘটে গত ২ জানুয়ারি শুক্রবার সকালে গুলশানের নদ্দা এলাকার মোড়ল বাজারে। স্থানীয় একটি মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে চুরির অভিযোগ তুলে ওই নারীকে আটক করা হয়। অভিযোগ ছিল, তিনি এক শিক্ষকের কক্ষে রাখা পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিয়েছিলেন।
মাদ্রাসার দুই শিশুশিক্ষার্থী বিষয়টি দেখতে পেয়ে চিৎকার করলে শিক্ষকরা ঘটনাস্থলে এসে ওই নারীকে আটক করেন। পুলিশের কাছে হস্তান্তর করার পরিবর্তে তাঁরা নিজেরাই ‘শাস্তি’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেই সিদ্ধান্তের ফল হিসেবেই ওই নারীকে খুঁটিতে বেঁধে ঠান্ডা পানি ঢেলে নির্যাতন করা হয়।
নির্যাতনের পর বাসে তুলে দেওয়া হয়
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্যাতনের একটি পর্যায়ে ওই নারীকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং পরে তাঁকে উত্তরাগামী একটি বাসে তুলে দেওয়া হয়। তবে তাঁর পরিচয়, ঠিকানা কিংবা বর্তমান অবস্থান—কোনো কিছুই এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। এলাকাবাসীর কেউ তাঁকে চিনতে পারেননি, ফলে ধারণা করা হচ্ছে তিনি ওই এলাকার বাসিন্দা নন।
পুলিশি অভিযান, কিন্তু ভুক্তভোগী নিখোঁজ
ভিডিওটি নজরে আসার পর গুলশান থানা পুলিশ রাতেই অভিযান চালায়। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পাঁচজনকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মাদ্রাসার দুই শিক্ষক এবং তিনজন শিক্ষার্থী। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—নির্যাতিত নারী কোথায়—তার কোনো উত্তর এখনো মেলেনি।
পুলিশ জানিয়েছে, এখনো আনুষ্ঠানিক মামলা হয়নি। ভুক্তভোগীকে খুঁজে না পাওয়া গেলে আইনগত পদক্ষেপ কীভাবে নেওয়া হবে, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভের ঝড় উঠেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—আইনের শাসন কোথায়? চুরির অভিযোগ সত্য হলেও, কাউকে এভাবে প্রকাশ্যে নির্যাতন করার অধিকার কারও নেই।
অধিকারকর্মী ও সচেতন নাগরিকরা বলছেন, এটি শুধু একজন নারীর ওপর সহিংসতা নয়, এটি পুরো বিচারব্যবস্থাকে অবজ্ঞা করার নামান্তর। অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে ভবিষ্যতে এমন ‘গণশাস্তি’ আরও ভয়ংকর রূপ নিতে পারে।
এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে নির্যাতিত নারীকে ঘিরে। তিনি কোথায়, কেমন আছেন, আদৌ বেঁচে আছেন কি না—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না মিললে এই বর্বর ঘটনার দায় শুধু কয়েকজন ব্যক্তির নয়, পুরো ব্যবস্থার ওপরই বর্তাবে।
Analysis | Habibur Rahman
